জিএম কাদেরের সঙ্গে টেলিসংলাপ

গঠনতন্ত্রে চেয়ারম্যানের ‘একক ক্ষমতা’ গণতন্ত্রের জন্য ভালো নয়: রাঙ্গা

জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা মনে করেন, জাপার গঠনতন্ত্রে চেয়ারম্যানের ‘একক ক্ষমতা’র বিষয়টি গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। তার প্রত্যাশা, সদ্য প্রয়াত মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুর পদে নতুন কাউকে নির্বাচনের আগে দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের যেন সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে নেন। যদিও জাপার গঠনতন্ত্রের ২০/১(১)ক ধারা অনুযায়ী মহাসচিব পদে কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষমতা কেবল চেয়ারম্যানেরই। তবে এ বিষয়ে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করার মধ্য দিয়ে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়ার মত দিয়েছেন জাপার ‘পিতৃভূমি’ রংপুরের নেতারা।

বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে চলমান ইস্যুতে খোলামেলা কথা বলেন জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা। তিনি জানান, দলের প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ দলের কাউন্সিল করে সবার মতামত নিয়ে তাকে দলের মহাসচিব করেছিলেন। তিনি তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেছেন। এরশাদ জীবিত থাকার সময় তার কর্মকাণ্ডে কখনও অখুশি ছিলেন না। কিন্তু তিনি মারা যাওয়ার পর এক বছরের মধ্যেই তাকে দলের মহাসচিব পদ থেকে অবসরে পাঠিয়ে দেন দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের। তাকে যখন দলের মহাসচিব করা হয় তখন তিনি ছিলেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।

‘আমি দলের কাউন্সিল অধিবেশনে নেতা কর্মীদের সর্ব সম্মতিতে আমাকে দলের মহাসচিব নির্বাচিত করা হয়েছিলো’, বলছিলেন রাঙ্গা। তিনি যোগ করেন, ‘জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্রে দলের চেয়ারম্যানকে একক ক্ষমতা দেওয়া আছে, সেখানে চেয়ারম্যান ইচ্ছে করলে যখন-তখন যাকে-তাকে দলের পদ পদবী প্রদান অব্যাহতিসহ যা ইচ্ছে তাই করতে পারেন।’ 

মসিউর রহমানের ভাষ্য, ‘এটা গণতান্ত্রিক দলের জন্য ভালো নয়।’ তিনি বলেন, ‘দলের প্রতিষ্ঠাতা এরশাদ যদিও একই ক্ষমতার মালিক ছিলেন, তবে তিনি বড় ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করতেন।’ দলের মহাসচিব পদ থেকে অবসর দেওয়ার বিষয়ে তার কোনও ক্ষোভ নেই, বলে জানান রাঙ্গা। তবে তার মত, ‘দলের গঠনতন্ত্রে একক ক্ষমতা থাকা উচিত নয়।’

দলের পরবর্তী মহাসচিব নির্ধারণ প্রসঙ্গে জাপা নেতা মসিউর রহমান বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার মত হলো দলের কো-চেয়ারম্যান আছেন, বেশ কয়েকজন প্রেসিডিয়াম মেম্বার আছেন, সিনিয়র নেতা আছেন, সবার সঙ্গে আলোচনা করে মহাসচিব পদে নিয়োগ দিলে ভালো হবে। এটাই হবে সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।’ 

রাঙ্গা মনে করেন, ‘এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।’ এরপর তিনি বলেন, ‘তবে এটা বলতে পারি আমি দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের সঙ্গে আগেও ছিলাম এখনও আছি ভবিষত্যেও থাকবো।’

জিএম কাদেরের সঙ্গে টেলিসংলাপ

জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব সংসদে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ এবং আবারও মহাসচিব হতে আগ্রহী মসিউর রহমান রাঙ্গার সঙ্গে দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের মতবিরোধ ও মনোমালিন্য দূর করতে সোমবার রাতে টেলি কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে, দলের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র এ প্রতিনিধিকে নিশ্চিত করেছে। বৈঠকে রাঙ্গার সঙ্গে জিএম কাদেরের মনোমালিন্য দূর করার বিষয়ে দূতিয়ালি ভূমিকা পালন করেছেন রংপুর মহানগর জাপার এক শীর্ষ নেতা। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী ওই বৈঠকে রাঙ্গা ও কাদেরের মধ্যে দূরত্ব কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছেন তিনি। 

রংপুরে টক অব দ্য টাউন
জাপার মহাসচিব বাবলু করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার পর আবারও নতুন মহাসচিব কে হবেন এ নিয়ে চলছে নানান জল্পনা কল্পনা। সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে কয়েকজনের নাম এসেছে। এদের মধ্যে সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার, মসিউর রহমান রাঙ্গা এবং গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ আসনের এমপি ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী আলোচনায় আছে। তবে দলের চেয়ারম্যান শামীম হায়দার পাটোয়ারীকে দলের মহাসচিব করতে চান- এমন কথা চাউর হয়েছে। যদিও প্রকাশ্যে এ সম্পর্কে কেউ কোনও কথা বলেননি। এছাড়া কাজী ফিরোজ রশীদ মহাসচিব হতে আগ্রহী বলেও জাপার রাজধানী রংপুরে আলোচনা চলছে।

রংপুরে মহানগর জাপার সভাপতি ও সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা সাংবাদিকদের বলেন, মহাসচিব এমন ব্যক্তির হওয়া উচিত যিনি দলকে আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করবেন। দলের জন্য নিবেদিত প্রাণ হবেন। আলাপ আলোচনা সব সময় ভালো পদক্ষেপ বলে মত দেন তিনি।

রংপুর মহানগর জাপার সাধারণ সম্পাদক এসএম ইয়াসির বলেন, ‘এর আগে যারা দলের মহাসচিব ছিলেন রুহুল আমিন হাওলাদার, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, মসিউর রহমান রাঙ্গা প্রয়াত বাবলু ভাই সবাই দলের জন্য ভালো কাজ করেছেন। আমি মনে করি দলের মহাসচিব করা নিয়ে যেন দলের মধ্যে কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে। সে জন্য দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়ে মহাসচিব মনোনীত করা প্রয়োজন।’

এসএম ইয়াসির আরও বলেন, ‘ঢাকার অনেক নেতা চান না জাপার নেতৃত্বে রংপুরের কেউ থাকুক। মসিউর রহমান রাঙ্গাকে যদি আবারও নতুন করে দলের মহাসচিব করা হয় তাতে তার কোনও আপত্তি নেই। তবে যাই করা হোক আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে দলের জন্য মঙ্গল হবে।’

রংপুর জেলা জাপার সিনিয়র সহ-সভাপতি আজমল হোসেন লেবু বলেন, ‘দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের একজন সৎ ও নীতিবান মানুষ। তার ওপর আমাদের বিশ্বাস আছে। তিনি যে সিদ্ধান্ত নেবেন তাতে আমাদের সমর্থন থাকবে।’ 

রংপুর জেলা জাপার সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমি মনে করি রাঙ্গা দলের জন্য নিবেদিত প্রাণ কর্মী। আগামী নির্বাচনে রংপুর অঞ্চলের ২২টি আসনে জাপার প্রার্থীদের জয়ী করতে তার নেতৃত্বের প্রয়োজন আছে।’

বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপে জেলার তৃণমূলের নেতারা দলীয় আলোচনার মধ্য দিয়ে মহাসচিব নির্ধারণের কথা বলেন। 

এ প্রসঙ্গে পীরগাছা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা জাপা সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, রাঙ্গাকেই আবার দলের মহাসচিব করলে মঙ্গল হবে।

আর বদরগঞ্জ উপজেলা জাপার সভাপতি অ্যাডভোকেট মোকাম্মেল হক বলেন, ‘জিএম কাদের দলের চেয়ারম্যান। তিনি দলের জন্য যাকে মহাসচিব মনোনীত করবেন, তার সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন থাকবে।’