রংপুর মেডিক্যাল কলেজে (রমেক) টেন্ডার জালিয়াতি করে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় দুই বছর পর তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ‘অপ্রয়োজনীয় নিম্নমানের ব্যবহার অনুপোযোগী’ এসিসহ বিভিন্ন সামগ্রী কেনার নামে দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে ‘পছন্দের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান’কে কার্যাদেশ প্রদান করে মালামাল সরবরাহ করার আগেই মাত্র ৬ দিনের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা বিল প্রদান করা হয়।
এ ঘটনায় আজ রবিবার (২৬ ডিসেম্বর) ও আগামীকাল সোমবার (২৭ ডিসেম্বর) রংপুর মেডিক্যাল কলেজের চার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বর্তমান অধ্যক্ষকে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য প্রধান কার্যালয়ে তলব করেছে দুদক।
দুদকের প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত সহকারী পরিচালক সহিদুর রহমান স্বাক্ষরিত এ চিঠি দেওয়া হয়েছে। যার স্মারক নম্বর ৩৬১৪৭, তারিখ ২০ ডিসেম্বর ২০২১। চিঠিতে যাদের তলব করা হয়েছে তারা হলেন, রংপুর মেডিক্যাল কলেজের সাবেক সচিব ফজলুল হক, সাবেক হিসাব রক্ষক এমদাদুল হক, স্টোর কিপার সাহানা পারভীন ও অফিস সহকারী মহসিন আলী। এ ছাড়া আগামীকাল সোমবার রংপুর মেডিক্যাল কলেজের বর্তমান অধ্যাক্ষ অধ্যাপক নুরন্নবী লাইজুকেও সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তলব করা হয়েছে।
দুদকের সহকারী পরিচালক সহিদুর রহমান চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, রংপুর মেডিক্যাল কলেজে টেন্ডার দুর্নীতির ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তাকে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে। সে কারণে সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে উপরোক্ত কর্মকর্তাদের দুদক প্রধান কার্যালয়ে উপস্থিত থেকে তদন্তে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে।
মেডিক্যাল কলেজটিতে টেন্ডার দুর্নীতির ব্যাপারে ২০১৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর দুদকের প্রধান কার্যালয়ে উপ-সহকারী পরিচালক ফেরদৌস রহমান বাদি হয়ে সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নুর ইসলাম ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল সার্জিক্যাল অ্যান্ড সার্জিকাল কোম্পানির মালিক জাহের উদ্দিন, কমিউনিটি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সরোয়াত হোসেনসহ ছয় জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছিলেন।
মামলার দীর্ঘ দুই বছরেও দুদক কেন তদন্ত করেনি, তার কোনও ব্যাখ্যা নেই। এ ঘটনায় রংপুরের বিভিন্ন মহল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছে, দুদক রংপুর মেডিক্যাল কলেজে এত বড় দুর্নীতির মামলাটি দুই বছর তদন্ত না করে ফেলে রেখে আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয়েছে। অনেক আগেই মামলাটি চার্জশিট দেওয়া উচিত ছিল। এতদিনে বিচার শুরু হওয়া দরকার ছিল। কিন্তু কেন হয়নি এর জবাবদিহিতা দুদককেই দিতে হবে।
মামলার তদন্তের ধীরগতির সঙ্গে সঙ্গে সাক্ষীদের ঢাকায় তলবেরও সমালোচনা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ব্যাপারে রংপুর দুদকের সহযোগী সংগঠন দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেন বলেন, মামলাটি রংপুরের। এখানে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ও আছে। মামলাটির তদন্ত করতে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিজেই রংপুরে আসতে পারতেন। রংপুর কার্যালয়ে বসে সাক্ষ্যগ্রহণ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে সবাইকে ঢাকা অফিসে তলব করেছেন। এর অর্থ হচ্ছে সাক্ষীদের হয়রানি করা। এটা ক্ষমতার অপব্যবহার ছাড়া আর কিছুই নয়। আর এটা তিনি করতেও পারেন না বলেই আমার মনে হয়।
এমনিতেই দু‘বছর তদন্ত না করে মামলাটি ফেলে রাখা হয়েছে, এখন নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ করে মামলাটি বিলম্বিত করার একটা কৌশল বলেও মনে করেন তিনি।
এ ব্যাপারে দুদক কর্মকর্তা সহিদুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, রংপুর মেডিক্যাল কলেজে এসিসহ বিভিন্ন সামগ্রী ক্রয় করার জন্য ২০১৮ সালের ৫ মে তারিখে টেন্ডার আহ্বান করেন তৎকালীন অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নুর ইসলাম। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেয়, কিন্তু অংশগ্রহণকারী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান একই ব্যক্তি ও তার স্বজনদের। ২০১৮ সালের ২১ জুন টেন্ডার মূল্যায়ন করা হয়। মূল্যায়ন কমিটি ওই দিনই বেঙ্গল সার্জিক্যাল অ্যান্ড কোম্পানিকে সর্বনিম্ন দরপত্র দাতা হিসেবে ৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা মূল্যের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করার জন্য কার্যাদেশ প্রদান করেন। মাত্র ৬ দিনের মধ্যে কোনও মালামাল গ্রহণ না করেই ২৭ জুন ঠিকাদারকে ৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকার বিল প্রদান করা হয়। পরবর্তীকালে তদন্ত করে দেখা যায় বিভিন্ন দেমের সিল ও লেবেল লাগিয়ে নিম্নমানের ব্যবহার উপযোগী মালামাল সরবরাহ করা হয়েছে। এ ঘটনা প্রাথমিক তদন্ত শেষে অধ্যক্ষসহ ৬ জনকে আসামি করে দুদক মামলা দায়ের করে।