দিনাজপুরের ৩ শিক্ষার্থীর বাড়িতে এখন শুধুই শোকের মাতম

কেউ হতে চেয়েছিল পুলিশ, কেউ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার আর কেউ উপার্জন করে সংসারে বাবাকে সহযোগিতা করতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের সেই আশা নস্যাত করে দিয়েছে বেপোরোয়া এক ট্রাক। পেছন থেকে ধাক্কা দেওয়ায় দিনাজপুরে তিন ছাত্র নিহত হয়েছেন। ওই ছাত্রদের বাড়িতে এখন শুধুই শোকের মাতম।

রবিবার (২ জানুয়ারি) দুপুর ২টার দিকে দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও মহাসড়কের বীরগঞ্জ উপজেলার মাকড়াই কমরপুর নামকস্থানে এই দুর্ঘটনা ঘটে। ওই সময় তিন বন্ধু উপজেলার কবি কাজী নজরুল ইসলাম উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বাড়ি ফিরছিলেন।

নিহত তিন শিক্ষার্থীরা হলো বীরগঞ্জ উপজেলার সুজালপুর স্লুইসগেট এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলমের ছেলে শাহরিয়ার শুভ (১৫), শুকুর আলীর ছেলে মোজাহিদ (১৪) ও আফসার আলীর ছেলে শাহাদত হোসেন (১৫)। মোজাহিদের বাবা মৎস্যজীবী, শাহাদতের বাবা কৃষক ও শাহরিয়ারের বাবা ট্রাক্টর চালক।

এলাকাবাসী ও নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যরা জানান, ছোট থেকেই তিন বন্ধুর একসঙ্গে বেড়ে ওঠা, খেলাধুলা, একই সঙ্গে স্কুলে যাওয়া, আড্ডা ও গল্প। শেষ পর্যন্ত মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তারা একই সঙ্গে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলো। নিমিষেই ভেঙে গেলো তিন পরিবারের স্বপ্ন।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, নিহত তিন শিক্ষার্থীর মধ্যে পুলিশ হতে চেয়েছিল শাহাদত, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন ছিল শাহরিয়ারের। আর নিজে আয় করে সংসারে বাবাকে সহযোগিতা করতে চেয়েছিল মোজাহিদ। এখন স্বপ্ন ভাঙার চেয়ে বুকের ধন হারানোর বেদনা মা-বাবার কাছে আরও বেশি।

নিহত শাহরিয়ারের মা ছাদেকা বেগম কান্নাজডড়িত কণ্ঠে বলেন, ভাত খেতে চেয়েছিল। মোটরসাইকেলের তেল কেনার জন্য টাকা চেয়েছিল। কিন্তু আমি দেইনি। মোটরসাইকেল চালানোটা বারবারই নিষেধ করতাম। পরে কোথা থেকে টাকা জোগাড় করে মোটরসাইকেল নিয়ে স্কুলে যায়।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে শাহাদতের মা বলেন, সকালে হোটেল থেকে আনা পরোটা খেয়ে স্কুলে গিয়েছিল বই আনতে। এরপর বই রেখে শাহরিয়ারের সঙ্গে চলে যায়। আর আমার সঙ্গে দেখা হয়নি। আমার ছেলের স্বপ্ন ছিল পুলিশে চাকরি করবে।

দুর্ঘটনায় নিহত মোজাহিদের বাবা শুকুর আলী বলেন, আমার ছেলের মেধাবী ছিল। গতকাল আমার কাছে এক হাজার টাকা চেয়েছিল, কিন্তু আমি দেইনি। তখন সে আমাকে বলে, আব্বু টাকাটা দাও। দুই বছর পর থেকে আর লাগবে না। এরপর আর আমার সঙ্গে দেখা হয়নি। সকালেই কাজের জন্য বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছিল সে। পরে স্কুলের ম্যাডাম আমাকে ফোন দিয়ে হাসপাতালে যেতে বলে। হাসপাতালে গিয়ে দেখি আমার ছেলে আর নাই।

নিহত শাহাদতের বাবা আফসার আলী বলেন, আমার ছেলের পড়ালেখা ভালো ছিল। লেখাপড়া করে পুলিশের চাকরি করতে চেয়েছিল সে। সবসময় সে এই কথাটা বলতো। সকাল ৯টায় বাড়ি থেকে বের হয় স্কুলের উদ্দেশে। তারপর সেখান থেকে কোথায় গেছে বলতে পারি না।

নিজেরা পড়ালেখায় ভালো, অন্যদের ভালো পরামর্শও দিত তারা। মোজাহিদ ৮ম, শাহরিয়ার ৯ম ও শাহাদত ৯ম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে দুপুরে বাড়ি ফিরছিল। সকালেও স্কুলে দেখা হয়েছে বন্ধুদের সঙ্গে। সহপাঠীদের মৃত্যুতে দারুণভাবে শোকাহত তাদের অন্য বন্ধুরাও।

নিহতদের সহপাঠী বিপ্লব জানায়, স্কুলে এক সঙ্গে বই নিয়েছি আমরা। শাহরিয়ার আমাকে বলেছিল যে আমি সাইন্স (বিজ্ঞান বিভাগ) নেবো তুইও নে। এক সঙ্গে মেকানিক্যাল শিখবো। এরপর আমাকে ও আরও একজনকে রেখে তারা মোটরসাইকেলে করে স্কুল থেকে চলে যায়।

অপর সহপাঠী মানিক জানায়, ছোট থেকেই আমরা একসাথে চলাফেরা করি। আজকে শাহরিয়ারের সঙ্গে আমারও যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু একটি মোটরসাইকেলে চার জন যাওয়া যাবে না বলে আমি আর যাইনি।

স্থানীয়রা জানায়, পেছন থেকে ধাক্কা দেওয়ার ফলে দুর্ঘটনা ঘটেছে। এটিতে ওই ছাত্রদের কোন দোষ ছিল না। 

স্থানীয় নুরন্নবী ইসলাম নাঈম বলেন, পাশের বাড়ির এক বোন আমাকে অ্যাক্সিডেন্টের বিষয়টি জানালে আমি ছুটে যাই। এ সময় দেখি যে মোজাহিদ বেঁচে আছে। হাসপাতালে নেওয়ার ঘণ্ঠাখানেক পর সে মারা যায়। আমি শুনেছি যে, ট্রাক তাদের পেছন থেকে ধাক্কা দিয়েছিল।

এদিকে রবিবার সন্ধ্যায় নিহত ছাত্রদের জানাজা শেষে দাফন করা হয়। বীরগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সোহেল রানা জানান, দুপুরে কবি কাজী নজরুল ইসলাম উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে শাহরিয়ারের বাবার মোটরসাইকেলে তিন জন বাড়ি ফিরছিল। পথে একটি মাইক্রোবাসকে সাইড দিতে গেলে পেছন থেকে পণ্যবাহী একটি কাভার্ডভ্যান তাদের পিষ্ট করে পালিয়ে যায়। 

তিনি আরও জানান, ঘাতক ট্রাকটি দুর্ঘটনার পর পালিয়ে গেছে। তবে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি ট্রাক ও চালককে আটকের জন্য।