ব্যাটারি পোড়ানো কারখানার গ্যাসে মরছে গরু

‘আগত তো কুনো কারখানা আছেলো না। নদীর ধারেই গরুগুলা বান্ধি আইসেছেনো। ওই গরুর বাচ্চা হছেলো, দুধ হছেলো। কয়মাস আগত নদীর ধারত ব্যাটারির কারখানা দিল। তারপর মোর একে একে তিনটা গরু মারা গেইল। তিনটা ছাগল গাভিন আছেলো, সেগুলোর বাচ্চাও নষ্ট হই গেইল। হামরা তো গরীব মানুষ, দুই-একটা গরু-ছাগল না পুষিলে কি করি খামো। গরুর দুধ বিক্রি করিয়াও কিছু ইনকাম হছেলো। তিনটা গরু আছেলো, তিনটায় মারা গেইল। এই কারখানার জন্য মোর গোয়ালটাই শুন্য হই গেইল, হামার অনেক ক্ষতি হইল। এই ক্ষতি কে পুষাবে, হামরা চাই এই কারখানা বন্ধ হোক।’

কেঁদে কেঁদে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার ভিয়াইল ইউনিয়নের নানিয়াটিকর গ্রামের কাচুরাম রায়ের স্ত্রী সূর্য্য বালা। তার কথায় জানা যায়, গত কয়েকমাস আগে ওই এলাকায় একটি ব্যাটারি পুড়িয়ে শিসা তৈরির কারখানার বিষাক্ত গ্যাসের কারণে অসুস্থ হচ্ছে গরু ও ছাগল। গত দুই মাসে ওই এলাকায় ১৬টি গরুর মৃত্যু হয়েছে। প্রতিনিয়তই আক্রান্ত হচ্ছে গৃহপালিত বিভিন্ন পশু।

ইতোমধ্যে ওই কারখানা বন্ধের দাবি জানিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পরিবেশ অধিদফতরসহ বিভিন্ন দফতরে আবেদন জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অবৈধ ব্যাটারি পোড়ানোর কারখানার বিষাক্ত ধোয়ার ফলে গরুগুলোর মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন চিরিরবন্দর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা। 

অন্যদিকে পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন- ওই কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য অনেক আগেই মালিককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুই-একদিনের মধ্যেই এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়- সবুজে ঘেরা প্রকৃতি। চারপাশে আলু, টমেটো, বোরো ধানের ক্ষেত। আম, লিচু, জাম, কাঠালসহ হরেক রকমের গাছপালা। গ্রামের পশ্চিম দিকের শেষ প্রান্তে সদর ও চিরিরবন্দর উপজেলার মাঝখান  দিয়ে বয়ে চলেছে আত্রাই নদী। আর সেই নদীর পূর্ব পাশে পুরাতন ব্যাটারি পুড়িয়ে শিসা তৈরির কারখানা স্থাপন করেছেন আব্দুল মালেক নামের এক ব্যক্তি। আব্দুল মালেক ভিয়াইল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নির্বাহী সদস্য।

ব্যাটারির বিষাক্ত ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে মারা যাচ্ছে গবাদি পশুকারখানার কাছে যেতেই ঝাঁঝালো পোড়া গন্ধ। আম ও লিচুর বাগানের ভেতরে ব্যাটারি পুড়িয়ে শিসা তৈরির জন্য টিন দিয়ে ঘেরা কারখানায় রয়েছে একটি ডিজেলচালিত জেনারেটর। কারখানার আশপাশের আম, কাঁঠাল ও লিচু গাছের পাতা ঝলসে গেছে। চারপাশে পুরাতন ব্যাটারি আর ব্যাটারির ভগ্নাংশ।

স্থানীয়রা জানান, রাতের সময় এখানে ট্রাকে করে লোড দিয়ে নিয়ে আসা হয় পুরাতন ব্যাটারি। সেই ব্যাটারি কেটে প্লাষ্টিক আলাদা করা হয়। তারপর ভারী ধাতু গলিয়ে শিসা তৈরি করে আবার ট্রাকে করে পাঠানো হয় ঢাকায়। রাতভর চলে এই কর্মযজ্ঞ। আর ব্যাটারি পোড়ানোর ফলে রাতের বেলায় দুর্গন্ধে ভরে উঠে চারপাশ। কারখানাটি চালু করার পর থেকেই ওই গ্রামের গরু ও ছাগলের শ্বাসসকষ্ট রোগ দেখা দিয়েছে। গত ২ মাসে ১৬টি গরুর মৃত্যু হয়েছে। অসুস্থ গরুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন দফতরে দেওয়া অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে- কারখানাটি গড়ে ওঠার পর গত ২ মাসের মধ্যে ওই এলাকার সকাল রায়ের তিনটি গরু, বিমল রায়ের একটি গরু, বাবুল রায়ের একটি গরু, পরেশ রায়ের একটি গরু, সুভাশ রায়ের দুটি গরু, আশুতোষ রায়ের দুটি গরু, আলতাফ হোসেনের দুটি গরু, আনোয়ার হোসেনের একটি গরু, সুশিলা রায়ের একটি গরু ও শাহ আলমের দুটি গরু মারা গেছে।

এসব গরুগুলোর আনুমানিক মূল্য প্রায় ১০ লাখ টাকা। এছাড়াও এই কারখানার বিষাক্ত গ্যাসের ফলে প্রতিনিয়তই ওই গ্রামের গরুগুলো অসুস্থ হচ্ছে।

ওই এলাকার সুশীলা বালা নামে এক বৃদ্ধা বলেন, আমার দুইটা গরু। আমি এই নদীর বাঁধের গরু চড়াই। বাঁধের ধারে ব্যাটারি কারখানা হওয়ায় গ্যাসে আমার একটা গরু মারা গেছে। কারখানা হওয়ার কয়েকদিন পর হঠাৎ একদিন দেখি গরুটা খায় না। তারপরে বাড়ি নিয়ে গেলে ধরফর করে। ডাক্তার ডাকি, ডাক্তারও বলতে পারে না কি রোগ। সকালে গরুটা খাওয়া বন্ধ করলো। বিকালে ডাক্তার বললো আমার দ্বারা আর হবে না। ডাক্তারও গেল আমার গরুটাও মারা গেল। এখন একটা গরু আছে। ওই গরুর জন্য আমি এখন কান্দি বেড়াই। পরে যখন দেখি সবারই গরু মরছে তখন জানতে পারি এই কারখানার গ্যাসে গরুটা মারা গেছে। আমি চাই এই কারখানা বন্ধ হয়ে যাক।

পারভিন নামে এক নারী বলেন, আমরা ৯টা গরু। এই কারখানা আগে ছিল না। এখন কারখানার গ্যাসে একটা গরু আমার মারা গেছে। এর মধ্যে একটা বিক্রি করে দিছি। বেশি সমস্যা হচ্ছিল। এখন সাতটা গরু আছে। শুধু আমার না এই কারখানার জন্য আমাদের এলাকার ১৬ টা গরু মারা গেছে। এই কারখানার জন্য আমাদেরও নিঃশ্বাস নিতে সমস্যা হয়। যখন রাতে ঘুমাই এর গ্যাসে ঘুম হয় না। এই কারখানা বন্ধ না হলে গরু নয় আমদেরও সমস্যা হবে।

ভিয়াইল ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য কমল রায় বলেন, কারখানার কারণে গরু মারা যাচ্ছে, মানুষেরও শ্বাসকষ্টের সমস্যা হচ্ছে। বিষয়টির জন্য এলাকাবাসী বিভিন্ন দফতরে অভিযোগ দিয়েছি। আমি এলাকাবাসীর সঙ্গে আছি।

কারখানার মালিক আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল মালেক বলেন, স্থানীয়রা আমাকে জানিয়েছে। তবে কারখানার গ্যাসের কারণে গরু মারা গেছে বিষয়টি সঠিক নয়। তাছাড়া এই কারখানার জন্য আমাকে পরিবেশ অধিদফতর ছাড়পত্র দিয়েছে। ছাড়পত্র দেখতে চাইলে তিনি বলেন, এখন আমার কাছে নাই। তবে আমাকে আগামী ৫ মার্চ পর্যন্ত কারখানা চালানোর ছাড়পত্র দেওয়া আছে। এ সময় তিনি নিজেকে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নির্বাহী সদস্য হিসেবে দাবি করেন।

ব্যাটারির বিষাক্ত ধোঁয়ায় মরছে গাছকথা হলে চিরিরবন্দর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সারফরাজ হোসেন বলেন, আমি ওই এলাকা পরিদর্শন করেছি। অনেক গরুর চিকিৎসাও দিয়েছি এবং এখনও দিচ্ছি। ব্যাটারি পোড়ানোর ফলে যে গ্যাস তৈরি হচ্ছে তাতেই গরুগুলো অসুস্থ হচ্ছে। এই গ্যাস মানুষেরও ক্ষতি করবে। 

চিরিরবন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, আমি এলাকাবাসীর একটি অভিযোগ পেয়েছি। পরিবেশ অধিদফতরের সঙ্গে কথা বলে কারখানাটি বন্ধ করা হবে।

দিনাজপুর পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক একেএম ছামিউল আলম কুরশি বলেন, ইতোমধ্যে আমরা ওই কারখানার মালিককে কারখানাটি বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছি। এই ধরনের কারখানা চালানোর কোনও নিয়ম নেই। দুই একদিনের মধ্যে আমরা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

ব্যাটারি পুড়িয়ে শিসা তৈরির কারণে গরু মৃত্যুর ঘটনা দিনাজপুরে এটিই প্রথম না। এর আগেও ২০২১ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসে ফুলবাড়ী উপজেলার বাসুদেবপুর পাকড়ডাঙ্গা গ্রামে প্রায় ২০টি গরু মারা গিয়েছিল এমন কারখানার বিষাক্ত গ্যাসের কারণে। পরে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত করে কারখানাটি উচ্ছেদ করে প্রশাসন।