মুকুলের পরিবর্তে নতুন পাতা, লিচুর ফলন নিয়ে শঙ্কা

সময় এখন লিচুর গাছে মুকুল আসার। কিন্তু মুকুলের পরিবর্তে গাছে গাছে এসেছে নতুন পাতা। মুকুল আসার এই সময়ে নতুন পাতার আগমন ভাবিয়ে তুলেছে দিনাজপুরের লিচু চাষিদের। কারণ মুকুলের পরিবর্তে নতুন পাতা আসলে লিচুর ফলন ভালো পাওয়া যাবে না। আর ফলন না পাওয়া গেলে বছরজুড়ে লিচু গাছে যে পরিচর্যা বাবদ খরচ তা তুলতে পারবেন না তারা। লিচুর মুকুল থেকে যে পরিমাণে মধু আহরণ হয় তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন মধু খামারিরা। 

দিনাজপুরের লিচু দেশের পাশাপাশি বিদেশেও সমাদৃত। গত বছর এই জেলাতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা লিচুর বেচাকেনা হয়েছে। আর লিচুর মুকুল থেকে উৎপাদিত মধু আহরণ করা হয়েছে প্রায় ৫০ কোটি টাকার।

জেলা সদরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গাছে মুকুল অনেক কম। মুকুলের পরিবর্তে এসেছে নতুন বা কচি পাতা। গাছে মুকুলের চেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে লাল রংয়ের কচি পাতা। এর ফাঁকে ফাঁকে মুকুল ধরলেও গত বছরগুলোর তুলনায় কম। লিচুর সামান্য মুকুলগুলোও যাতে ঝরে না যায় সেজন্য পরিচর্যা শুরু করেছেন চাষিরা। গাছে পানি দিচ্ছেন, মুকুলে স্প্রে করছেন তারা। 

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরেই গাছে গাছে নতুন পাতা বেশি হচ্ছে মুকুলের পরিবর্তে। কৃষকদের অভিযোগ, যেখানে-সেখানে গড়ে ওঠা ইটভাটা ও কলকারখানার কারণে গাছে ছাই ও ময়লা জমছে। এছাড়া রাসায়নিকের প্রভাবের কারণেও মুকুল কম এসেছে বলে শঙ্কা তাদের। তবে গত কয়েক বছর ধরে গাছে মুকুলের পরিমাণ কম আসলেও কৃষি বিভাগ থেকে কোনও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ চাষিদের।

মাসিমপুর এলাকার কৃষক শরিফুল ইসলাম জানান, ‘গত কয়েক বছর ধরেই গাছে মুকুলের পরিমাণ কম। এবার তো মুকুলই আসেনি। গাছে শুধুই নতুন পাতা। গাছে যদি নতুন পাতা আসে তাহলে মুকুল কম আসে। আর মুকুল না আসলে ফল তো আসবেই না। এবার নিশ্চিত লোকসানের মুখে পড়তে হবে।’

মুকুলের পরিবর্তে ‍লিচু গাছে এসেছে নতুন পাতা

উলিপুর এলাকার সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘অর্ধেকের বেশি গাছেই মুকুল আসেনি। কিছু গাছে নতুন পাতার ফাঁকে মুকুল এসেছে। সেগুলোর পরিচর্যা করছি। লিচু এমন একটি ফল যার উৎপাদন ভালো হওয়ার জন্য পুরো বছরই খেয়াল রাখাতে হয়। ছয় মাস আগে থেকেই পরিচর্যা শুরু করতে হয়। এই পরিচর্যা, পানি সেচ, স্প্রে বাবদ যে খরচ হয়েছে তাতে করে যে মুকুল এসেছে তা হতাশার।’

উলিপুর এলাকার শামসুল হক বলেন, ‘আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত কোনও কৃষি কর্মকর্তা আসেননি। এবার আবহাওয়ার জন্য নাকি অন্য সমস্যার জন্য নতুন পাতা এসেছে তা আমাদের কেউ জানায়নি। নতুন পাতা আসলে মুকুল কম হবে। আমাদের আশঙ্কা এবার মুকুল কম আসায় লিচুর ফলন কম হবে। গত বছরও মুকুল কম এসেছিল। আমার চারটি বাগান নেওয়া হয়েছে, এবারে লিচুর ফলন অর্ধেক কম হবে। এতে লোকসান গুনতে হবে।’

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত বছর এই জেলায় ৫ হাজার ৪৮০ হেক্টর জমি থেকে লিচু উৎপাদন হয়েছিল ৩১ হাজার ৭৯০ টন। আর চলতি বছর দিনাজপুর জেলায় ১৩ হাজার ৯৯১টি বাগানে লিচুর আবাদ করা হচ্ছে। এ বছর আবাদ হচ্ছে ৫ হাজার ৪৮৫ হেক্টর জমিতে।

লিচু উৎপাদন ও সংরক্ষণ নিয়ে গবেষণাকারী মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, ‘বৈশ্বিক জলবায়ুর প্রভাব থেকে এমনটি হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। লিচুর মুকুল আসার সময়টা শীতের শেষের দিক এবং উষ্ণতার শুরুর দিক। অর্থাৎ শীতল ও উষ্ণ আবহাওয়ার একত্রিত অবস্থাতে লিচুর মুকুলের শীষ বের হয়। মুকুল আসা ও না আসার নির্ভর করে অক্সিন নামক হরমোনের উপর। বৈশ্বিক জলবায়ুর প্রভাবের কারণে অক্সিন হরমোন সঠিকভাবে মিশ্রিত না হওয়ায় নতুন পাতা বের হচ্ছে। আর এই নতুন পাতা বের হলে মুকুল হওয়ার সক্ষমতা হারিয়ে যায়। ফলে লিচুর ফলন হয় না। এটি নিয়ে বৃহৎ গবেষণার প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, ‘লিচুর মুকুল কম আসলে শুধুমাত্র কৃষকদের সমস্যা হয় না যারা মৌখামারি তাদেরও মধু আহরণ কমে যাবে। আমার একটি খামার রয়েছে। তবে লিচুর যে মুকুল কম এসেছে তাতে মধুর উৎপাদনও কমবে।’

দিনাজপুর সরকারি কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘লিচু থেকে চাষিরা যাতে মুখ ফিরিয়ে না নেয় সেজন্য এখনই গবেষণা প্রয়োজন। গবেষণা করে পদ্ধতি উদ্ভাবন করে কৃষকদের জানালে উৎপাদন বাড়বে।’

এ ব্যাপারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দিনাজপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ শাহ আলম জানান, এ বছর বৃষ্টি কম হয়েছে, শীতের প্রভাব কম ছিল। ফলে অন্যান্য বছরের তুলনায় লিচুর মুকুলের পরিবর্তে নতুন পাতা বের হয়েছে। তবে এবারে দেরিতে কিছু গাছে মুকুল এসেছে। এখন যে পরিমাণ মুকুল এসেছে তা কম। কিন্তু এই মুকুল সম্পূর্ণ টিকিয়ে রেখে যাতে উৎপাদনে ঘাটতি না হয় সেজন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।