রংপুর জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে অর্ধকোটি টাকার পদ-বাণিজ্যের অভিযোগ পাওয়া গেছে। একইসঙ্গে কমিটিতে মাদক ব্যবসায়ী, মাদকসেবী ও মোটরসাইকেল চোরাই সিন্ডিকেট চক্রের মূলহোতাকে পদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
জেলা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, নবগঠিত কমিটির সদস্য সচিব আফতাবুজ্জামান সুজনের বিরুদ্ধে মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগ রয়েছে। চোরাই সিন্ডিকেট চক্রের মূলহোতা হিসেবে তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশ। এ ছাড়া অছাত্র এবং মাদকাসক্ত ও মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের পদ দেওয়া হয়েছে।
ছাত্রদল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, গত ৯ জুন জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পদক শরীফ নেওয়াজ জোহাকে আহ্বয়ক ও হারাগাছ পৌরসভা ছাত্রদলের সদস্য সচিব আফতাবুজ্জামান সুজনকে সদস্য সচিব করে ২১ সদস্যের কমিটির ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় কমিটি। কমিটিকে এক মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করার নির্দেশনা দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত নবগঠিত আহ্বায়ক কমিটি সভা-ই করতে পারেনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নবগঠিত ছাত্রদলের জেলা কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে যিনি দায়িত্ব পেয়েছেন, সে আফতাবুজ্জামান সুজন মোটরসাইকেল চোর সিন্ডিকেট চক্রের অন্যতম সদস্য। তার বিরুদ্ধে ঠাকুরগাঁও ও রংপুর মেট্রোপলিটনের হারাগাছসহ বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রদলের সদস্য সচিব আফতাবুজ্জামান সুজন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য বিষয়ে আর কোনও মন্তব্য করতে চাই না।’
ছাত্রদলের যাকে আহ্বায়ক করা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আছে বলে জানালেন ছাত্রদলের বেশ কয়েকজন নেতা। এমনকি জেলা বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারাও তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ করেছেন।
ছাত্রদল নেতাদের অভিযোগ, নবগঠিত আহ্বায়ক কমিটিতে যাদের পদ দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে আহ্বায়ক ছাড়া বাকিরা ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতা। পদ-পদবী দেওয়ার ক্ষেত্রেও মানা হয়নি সিনিয়র-জুনিয়র কিংবা রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। এতে রংপুরসহ বিভিন্ন উপজেলা পর্যায়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে নবগঠিত ছাত্রদলের আহ্বায়ক শরীফ নেওয়াজ জোহার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, নবগঠিত কমিটিতে সাবেক জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি, সাংগঠনিক সম্পাদকসহ বিভিন্ন পদ পদবীর কাউকে রাখা হয়নি। এমনকি উপজেলা পর্যায়ের কোনও নেতাকেও স্থান দেওয়া হয়নি। যারা পদ পেয়েছেন তারা ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতা। নবগঠিত কমিটির সদস্য সচিব সুজনের বিরুদ্ধে মোটরসাইকেল চুরির দুটি মামলা রয়েছে। একটি মামলায় চার্জশিট হয়েছে বলে শুনেছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মামলার কপি ও চার্জশিটের কপি দেখেছি। বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতাদের জানানো হয়েছে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করার সময় দলের নিবেদিত প্রাণ নেতাকর্মীদের অবশ্যই রাখা হবে।’
এ ব্যাপারে পীরগাছা উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক লোকমান হোসেন বলেন, ‘জেলা কমিটি গঠন হলো অথচ উপজেলার আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবকে কোনও পদ দেওয়া হলো না। ইউনিয়ন পর্যায়ের কর্মীদের পদ দেওয়া হয়েছে। পৌরসভার আহ্বায়ককে মূল্যায়ন না করে মোটরসাইকেল চোর সিন্ডিকেটের আসামিকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। যার বিরুদ্ধে চুরির মামলাও রয়েছে। মাদকসেবনসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে সদ্যঘোষিত আহ্বায়ক কমিটি একটি সমন্বয়হীন ও অগ্রহণযোগ্য নামসর্বস্ব কমিটিতে পরিণত হয়েছে। আমরা রাজপথের ত্যাগী, সক্রিয় ও গ্রহণযোগ্যদের মাধ্যমে তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে কমিটি বাতিল করে নতুন কমিটির দাবি জানাই।’
সদ্য বিলুপ্ত জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি সজিব মজুমদার বলেন, ‘রংপুর জেলা ছাত্রদলের কমিটিতে ত্যাগী ও রাজপথের সক্রিয় নেতাদের বাদ দিয়ে যে কমিটি গঠন করা হয়েছে, তা প্রত্যাখ্যান করছি। এই কমিটি দিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত এক দফা আন্দোলন রাজপথে সফল করা সম্ভব হবে না।’
অপরদিকে, জেলা ছাত্রদলের সদ্য বিলুপ্ত কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান ও আইন বিষয়ক সম্পাদক সবুক্তগীন আহমেদ নিরব বলেন, ‘কমিটি সংগঠনের জন্য নিবেদিত প্রাণ, যোগ্য, ত্যাগী ও আন্দোলনরত নেতাদের মূল্যায়ন করা হয়নি। যোগ্যতাসম্পন্ন ত্যাগী ও মাঠপর্যায়ের আন্দোলনে সম্পৃক্ত নেতাদের বাদ দিয়ে, যারা কোনও আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিংবা সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিল না, তাদের পদ দেওয়া হয়েছে। যাদের অনেকের ব্যক্তিগত ও সামাজিক অবস্থানও নেই।’
হারাগাছ পৌরসভা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মো. ফরিদ ও যুগ্ম আহ্বায়ক বাঁধন মিয়া বলেন, ‘জেলা কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া আবতাবুজ্জামান সুজন হারাগাছ পৌরসভা কমিটির সদস্য সচিব ছিলেন। তিনি দায়িত্ব পালনে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। দলীয় কর্মসূচি, আন্দোলন সংগ্রামে ছিলেন আড়ালে। তাকে কেন জেলার গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হলো, তা আমাদের বোধগম্য নয়। তার বিরুদ্ধে মোটরসাইকেল চুরি সংক্রান্ত মামলা রয়েছে।’
তারাগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব আকতারুজ্জামান শুভ ও কাউনিয়া উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক তরিকুল ইসলাম জানান, জেলা ছাত্রদলকে যারা সুসংগঠিত করেছেন, দায়িত্বে ছিলেন তাদের পদে রাখা হয়নি। ত্যাগী ও রাজপথের পরিচিত মুখদের পরিকল্পিতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। কাউন্সিলের আয়োজন না করে কিংবা পূর্বের কমিটির কাউকে না জানিয়ে আকস্মিক জেলা ছাত্রদলের গঠনতন্ত্র পরিপন্থী ও বিধিবহির্ভূত কমিটি ঘোষিত হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেন তারা।
মিঠাপুকুর উপজেলার সদস্য সচিব শামসুল হক অভিযোগ করে বলেন, ‘আমরা যারা দলকে সুসংগঠিত করতে কাজ করেছি, তাদের বাদ দিয়ে জুনিয়র ছেলেদের নেতা বানানো হয়েছে। যাদের নেই কোনও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত ও সামাজিক অবস্থান। আমাদের কমিটিতে রাখা হয়নি অথচ আমার ইউনিটের কলেজ শাখার যুগ্ম আহ্বায়ককে জেলার সদস্য করা হয়েছে। এ ছাড়া এমন অনেককে পদ দেওয়া হয়েছে, যাদের পরিচয় আমরা নিজেরাই চিনি না।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা বিএনপির এক নেতা বলেন, জেলা ছাত্রদলের কমিটি গঠন নিয়ে অর্ধকোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে। টাকার বিনিময়ে বিতর্কিতদের পদ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছি।’
এ বিষয়ে জানতে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আনিসুর রহমান লাকুর মোবাইল নম্বরে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করা হলেও কল রিসিভ করেননি। তবে জেলা বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন আহ্বায়ক কমিটিকে এক মাস সময় দেওয়া হয়েছিল পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার জন্য। তারুণ্যের সমাবেশের কারণে সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়গুলো কেন্দ্রীয় ছাত্রদল খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবে।’