দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীদের দ্বন্দ্বের জেরে নীলফামারীর সৈয়দপুর পৌরসভায় ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন বন্ধ হয়ে আছে। প্রায় ২ মাস ধরে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন পৌরবাসী। এর ফলে পৌরসভার আয় যেমন কমছে, তেমনি অনুমোদন ছাড়াই ভবন নির্মাণের হিড়িক পড়েছে।
সূত্র জানায়, পৌরসভায় ৫ জন প্রকৌশলীর মধ্যে নকশা অনুমোদনের তথ্য যাচাইয়ের জন্য সার্ভেয়ার কর্তৃক সরেজমিন প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য রয়েছেন একজন। জমি অনুযায়ী নকশাকৃত ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সার্বিক বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীসহ ২ জন, সহকারী প্রকৌশলী ২ জন ও উপসহকারী প্রকৌশলী রয়েছেন। পর্যায়ক্রমে অনুমোদনে সুপারিশ করার পর পৌর মেয়র বা প্রশাসকের স্বাক্ষর নিয়ে চূড়ান্ত করেন।
ইতঃপূর্বে এই নকশা অনুমোদনের জন্য উৎকোচ প্রথা চালু ছিল পৌরসভায়। এই উৎকোচের অর্থ ভাগাভাগি করে নিতেন পৌর মেয়রসহ প্রকৌশলীরা। এক্ষেত্রে ভবনের উচ্চতা ও আয়তন অনুযায়ী পৌর বিধিমতে একটি নির্ধারিত ফি থাকলেও তার বাইরে অতিরিক্ত ১ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা নেওয়ার প্রমাণ রয়েছে। সম্প্রতি এই ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়েই প্রকৌশলীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব হলে তারা দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়। সে কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে।
গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর উৎকোচ নেওয়ার ব্যাপারেও অনেকটা সতর্ক। তাই অহেতুক নানা অজুহাত দেখিয়ে আবেদনকারীদের বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এই সেবা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। ফলে গত ২ মাসে অসংখ্য আবেদন জমা হলেও কোনোটির অনুমোদন দেওয়া হয়নি। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন বাড়ি মালিকরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকেই বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী নকশা অনুমোদনের জন্য পৌরসভায় জমা দেওয়া হলেও ৩ মাসেও তা পাইনি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আকারে ইঙ্গিতে পৌর ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেছে। আবার বলা হচ্ছে, পৌর মেয়র না থাকায় প্রশাসক অনুমোদন দিতে চাচ্ছেন না। কিন্তু আমরা জানতে পেরেছি কোনও কোনও প্রকৌশলী অর্থের বিনিময়ে অনুমোদন দিতে চাইলেও কেউ কেউ রাজি নয়। তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে এই পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) বলার পরও তিনি কোনও পদক্ষেপ নেননি। ফলে পৌর শহরে বাড়ি নির্মাণ নিয়ে চরম জটিলতা দেখা দিয়েছে।’
এ ব্যাপারে সৈয়দপুর পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আগে পৌর মেয়রের নির্দেশে আমরা নকশা অনুমোদন সম্পন্ন করতাম। যেগুলো আবেদন এসেছে তাতে জমি নিয়ে বিরোধের অভিযোগ থাকায় এবং বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য প্রকৌশলগত সমস্যা থাকায় অনুমোদন দেওয়া সম্ভব হয়নি।’ উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা কোনও উৎকোচ নিইনি। পৌর মেয়র নিতেন, সে দায় তো আর আমাদের নয়।’
নির্বাহী প্রকৌশলী সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘পটপরিবর্তনের পর তেমন কোনও আবেদন আসেনি। যেগুলো এসেছে পৌর প্রশাসকের সঙ্গে কথা হলে তিনি নির্বাচিত পৌর মেয়র না আসা পর্যন্ত অনুমোদন না দেওয়ার পরামর্শ দেন। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দায়িত্ব নিলে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সার্ভে করার পর জমি নিয়ে প্রতিবেশীদের অভিযোগ পাওয়া যায়। এ নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হলে তিনিও নকশা অনুমোদনের ব্যাপারে উৎসাহী নন। যে কারণে দীর্ঘ ২ মাস নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়নি।’ উৎকোচ নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমার কোনোকিছু জানা নেই। কেউ নিয়ে থাকলে তার দায় কেন আমি নেবো।’
পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নুর-ই আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নকশা অনুমোদনের জন্য কোনও আবেদন আমার কাছে আসেনি। প্রকৌশলীদের কাছে কোনও ফাইল আছে কি না, তা খোঁজ নিয়ে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। আর উৎকোচ গ্রহণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উল্লেখ্য, নিয়ম মেনে নকশা অনুমোদন নিতে চাইলে ঠুনকো অজুহাতে হয়রানি করা হয়। এ কারণে পৌরবাসী নিরুৎসাহিত হয়ে বিনা নকশাতেই বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন। এতে গত ২ মাসে কমপক্ষে ৩০টি ভবনের নকশা অনুমোদন ছাড়াই নির্মাণ করা হচ্ছে। তা ছাড়া পৌর কর্তৃপক্ষের তদারকির অবহেলায় বিনা নকশাতেই বাড়ি নির্মাণের হিড়িক পড়েছে।