গত দুদিন ধরে চাকরি ফিরে পেতে ঢাকায় সচিবালয়ের সামনে আমরণ অনশন করেছেন শৃঙ্খলা ভঙ্গসহ বিভিন্ন অভিযোগে অব্যাহতি পাওয়া ৩২১ জন এসআই। তাদের এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মামুনুর রশীদ মামুন। এর প্রতিবাদে রংপুরে বিক্ষোভ করেছেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাকর্মী ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মামুনুর রশীদ মামুন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। তিনি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহসম্পাদক ছিলেন। দ্বিতীয় কমিটিতে ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। তৃতীয় কমিটি ঘোষণার আগে সভাপতি প্রার্থী হিসেবে কেন্দ্রে লবিং করেছেন। তবে ওই কমিটিতে পদ না পেলেও কেন্দ্রীয় কমিটিতে সদস্য পদ পান।
মঙ্গলবার (১৪ জানুয়ারি) বিকালে অনশনরত অবস্থায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার কান্নাকাটি ও বক্তব্যের ভিডিও প্রচার হয়। ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় আলোচনা। বিষয়টি নজরে আসে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। এরপর ক্যাম্পাসজুড়ে শুরু হয় সমালোচনা। এ অবস্থায় তাকে গ্রেফতারের দাবিতে বুধবার (১৫ জানুয়ারি) বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। তারা বলছেন, ছাত্রলীগের এই নেতার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে চাঁদাবাজি, মাদক সেবন, শিক্ষার্থীদের মারধরসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছেন তার অনুসারীরা। অথচ এখনও তাদের কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি।
শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, মামুনের বাড়ি দিনাজপুরে হওয়ায় সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। এ ছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বীরগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান আবু হুসাইন বিপুর সঙ্গে তার সখ্যতা ছিল। মামুন নানা অপরাধে জড়িত।
অব্যাহতি পাওয়া দুজন এসআইয়ের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছাত্রলীগ নেতা মামুন অব্যাহতি পাওয়া এসআই সদস্যদের পুনর্গঠনে বড় ভূমিকা পালন করেছেন। সবাইকে উদ্বুদ্ধ করছেন। তিনি একাধিক মিডিয়ার সামনে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আর্তনাদ করে সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আপনারা জানেন, এখানে ৩২১টা পুলিশ বসে আছে। ৩২১টা পরিবারকে না, দেশের ১৮ কোটি মানুষকে সেবা দেওয়ার জন্য। একটা পুলিশ সদস্য কখন কাফনের কাপড় পরে। আপনারা সরকারের কাছে জবাবদিহি নেন। আমাদের কারও অপরাধ থাকলে তাকে জানিয়ে দিয়ে বাকিদের চাকরিতে বহাল করেন। যা করেন প্রকাশ্যে করেন।’
তবে মামুন এসব বক্তব্য দিয়ে নিজের অপকর্ম আড়ালের চেষ্টা করেছেন বলে জানালেন রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘মামুন ছাত্রলীগের প্রভাবশালী নেতা। ক্যাম্পাসে তার ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারতো না। তাকে পুলিশে নিয়োগ দিতে সুপারিশ করেছিলেন সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী।’
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টরের দায়িত্ব পালন করা একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মামুন ছাত্রলীগ পরিচয়ে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে প্রক্টর অফিসে একডজন অভিযোগ জমা আছে। যার বেশিরভাগই মারধর, চাঁদাবাজি, হলের সিট বাণিজ্য ও মাদকসেবনের। পুলিশে চাকরি পাওয়ার কয়েক মাস আগে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে তার মহড়ার বিষয়টি এখনও ফেসবুকে ঘুরছে।’
এসব বিষয়ে জানতে মামুনুর রশীদ মামুনের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দিলে বন্ধ পাওয়া যায়। এজন্য তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে এসআইদের আন্দোলনে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতার নেতৃত্ব দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ছাত্ররা। মঙ্গলবার ছাত্রলীগ নেতা মামুনের একটি ভিডিও সংবাদ মাধ্যমে প্রচার হলে শুরু হয় বিতর্ক।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বেরোবির অন্যতম সমন্বয়ক এস এম আশিকুর রহমান বলেন, ‘পুলিশ প্রশাসনে অধিকাংশই যে ছাত্রলীগ কোটায় চাকরি পেয়েছে—এইটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাদের মাঝে একদল ছিল পুলিশ প্রশাসনের বিভিন্ন পদে, যাদেরকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এইটা একদম উপযুক্ত সিদ্ধান্ত বলে আমরা মনে করি। প্রশাসন থেকে স্বৈরাচারের দোসরদের সরাতে হবে। সন্ত্রাসী ছাত্রলীগের নেতৃত্বে অনশনের নামে পুনরায় ছাত্রলীগকে প্রশাসনে পুনর্বহালের যে অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে তা বন্ধ করতে না। সন্ত্রাসী ছাত্রলীগের এসব অপচেষ্টা রুখে দিতে হবে। স্বৈরাচারের দোসরদের স্থান প্রশাসনে হবে না। তাদের রুখে দিতে আমরা সর্বদা প্রস্তুত। প্রয়োজনে আবারও রাজপথে নামবো। তবু কোনও ছাড় দেওয়া হবে না।’
অব্যাহতি পাওয়া এসআইদের নিয়ে আন্দোলনের নামে ষড়যন্ত্র করায় মামুনকে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রংপুর মহানগরের মুখপাত্র নাহিদ হাসান খন্দকার। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা পালানোর পরও স্বৈরাচারের দোসরদের ষড়যন্ত্র থেমে নেই। শৃঙ্খলা ভঙ্গসহ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকায় ওসব এসআইকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তাদের অধিকাংশই ছাত্রলীগ। এখন আন্দোলনের নামে ষড়যন্ত্র করছেন তারা। তাদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারের দাবি জানাচ্ছি।’
সারদা পুলিশ একাডেমি সূত্রে জানা গেছে, ৪০তম ক্যাডেট এসআই ব্যাচে প্রশিক্ষণের জন্য ৮২১ জন এসআই ছিলেন। ২০২৩ সালের ৪ নভেম্বর সারদায় বনিয়াদি প্রশিক্ষণ শুরু করেন তারা। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে গুরুতর অপরাধের অভিযোগে ২২ জনকে বাদ দেওয়া হয়। মাঠে ও ক্লাসে বিশৃঙ্খলার অভিযোগে চার ধাপে ৩২১ এসআইকে শোকজ করে একাডেমি। ইতিমধ্যে তাদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে গত ২১ অক্টোবর ২৫২ জন, ৪ নভেম্বর ৫৮, ১৮ নভেম্বর তিন জন এবং সর্বশেষ ১ জানুয়ারি আট জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এই এসআইদের সমাপনীর তারিখ গত ২৬ নভেম্বর স্থগিত হয়েছিল।
অব্যাহতি পাওয়া এসআইদের বিরুদ্ধে ‘নাশতা না খেয়ে বিশৃঙ্খলা এবং প্রশিক্ষণ চলাকালে হইচই’ করার অভিযোগ আনা হয়েছে। এই ব্যাচের অবশিষ্ট থাকা ৪৮০ জনের বুধবার সমাপনী হওয়ার কথা আছে।
প্রসঙ্গত, চাকরি পুনর্বহালের দাবিতে সচিবালয়ের সামনে গত সোমবার বিকাল থেকে আমরণ অনশনে বসেন অব্যাহতি পাওয়া এসআইরা। মঙ্গলবার রাত পৌনে ১টার দিকে জলকামান ব্যবহার করে তাদের ওপর পানি ছিটিয়ে সেখান থেকে সরিয়ে দেয় পুলিশ।