বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, “আমরা রাজনীতি করি মজলুম মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। স্বৈরাচার সরকার গায়ের জোরে আমাদের মসজিদ থেকে বের করে দেয়— বিগত সময়ে আমাদের নেতাকর্মীরা চরম অত্যাচার-জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তারপরও তারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাননি। আমাদের নেতাকর্মীরা দেশেই থেকেছেন, মানুষের পাশে থেকেছেন।”
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) সকালে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী এসএম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত ১০ দলীয় নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, “আমরা এই দেশের মাটি ভালোবাসি। জালিমের ভয়ে দেশ ছাড়বো না; সুখ-দুঃখে মানুষের সঙ্গেই থাকতে চাই। অসময়–সুসময়–সবসময়ই জনগণের পাশে থাকব। আল্লাহর উপর ভরসা করে একসঙ্গে পথ চলবো। আমরা দেশকে ভালোবাসি, মানুষকে ভালোবাসি— তাই উন্নত শিক্ষা, চিকিৎসা এবং বেকারত্ব নির্মুলে কাজ করতে চাই।”
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ‘দুটি নির্বাচন’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “জুলাই শহীদদের সম্মান দেখাতে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলতে হবে। অতীতের নির্বাচনে নারী-পুরুষ-তরুণ কেউই ভোট দিতে পারেনি। এবার জনগণকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জোয়ার তুলতে হবে।”
ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য আগামীর নির্বাচনে গাইবান্ধার পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের জয়ী করতে হবে জানিয়ে তিনি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মাওলানা মাজেদুর রহমান, আব্দুল করিম, মাওলানা নজরুল ইসলাম লেবু, ডা. আব্দুর রহিম সরকার ও আব্দুল ওয়ারেসের হাতে ‘ইনসাফের প্রতীক’ তুলে দিয়ে তাদের পরিচিত করে দেন।
এর আগে রংপুর থেকে সড়কপথে যাত্রা শুরু করে তিনি প্রথমে শহীদ আবু সাঈদের পীরগঞ্জের বাড়িতে গিয়ে কবরে ফাতেহা পাঠ করেন। সেখান থেকে সড়কপথেই পলাশবাড়ীর জনসভা মাঠে পৌঁছান তিনি।
নদী ও কৃষি উন্নয়ন প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “নদী আল্লাহর দান; আর উত্তরাঞ্চলের সেই নদীগুলো আজ মৃতপ্রায়। তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা— সব নদীর একই অবস্থা। গত ৫৪ বছরে নদী শাসনে কোনও উন্নয়ন হয়নি। যদি আমরা সরকার গঠন করি, নদীকে পুনর্জীবিত করবো এবং উত্তরাঞ্চলকে কৃষিভিত্তিক রাজধানীতে উন্নীত করবো। তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ নদী পুনরুদ্ধারের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।”
তিনি বলেন, “উত্তরাঞ্চলকে তিলে তিলে শেষ করা হয়েছে। অসংখ্য তরুণ চাকরির জন্য রাজধানীতে যেতে বাধ্য হয়। আমরা বেকার ভাতা দেবো না; বরং যুবকদের কাজ দেবো, যাতে তারা সম্মানের সঙ্গে আয় করতে পারে।”
কৃষকের ন্যায্য মূল্যের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াতের আমির বলেন, “বাংলাদেশ খাদ্যের ভান্ডার, অথচ কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের দাম পায় না। হাটবাজারে চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য চলছে। আমরা চাঁদাবাজি নির্মূল করব এবং কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করবো।”
উত্তরাঞ্চলে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা যাচাই-বাছাই করেছি— উত্তরাঞ্চলে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অত্যন্ত জরুরি। তাই গাইবান্ধায় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে।”
এছাড়া তিনি ইপিজেড বাস্তবায়ন, বালাসী ঘাটে টানেল নির্মাণ, ফুলছড়ি-সাঘাটা নদী শাসনসহ বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা তুলে ধরেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আয়োজিত এই জনসভায় সভাপতিত্ব করেন গাইবান্ধা-৩ (পলাশবাড়ী–সাদুল্লাপুর) আসনে জামায়াত মনোনীত এমপি প্রার্থী অধ্যক্ষ মাওলানা নজরুল ইসলাম লেবু। সভায় জামায়াতের কেন্দ্রীয়, বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতারা বক্তব্য রাখেন। পাশাপাশি উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন।
জনসভা ঘিরে পুলিশ ও প্রশাসন কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকধারী আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর টহলও জোরদার ছিল। মাঠ ও সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষায় জামায়াত ও সহযোগী সংগঠনের ৬০০-রও বেশি স্বেচ্ছাসেবক দায়িত্ব পালন করেন।
জনসভা শেষে তিনি সড়কপথে মোকামতলায় পথসভায় যোগ দেন এবং দুপুর ১২টায় বগুড়ায় আরেকটি নির্বাচনি জনসভায় ভাষণ দেন।