দিনাজপুর থেকে দেশের ৫৩ খালের খনন কর্মসূচি

কাটবে জলাবদ্ধতা, বাড়বে ফসল উৎপাদন

নাব্য সংকটে ভুগছে দিনাজপুরের খালগুলো। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা আর খরার সময়ে পানি সংকটে থাকেন স্থানীয় কৃষকরা। পানি না থাকায় কমেছে মাছের উৎপাদনও। জেলার মোট ৬৭টি খালের অবস্থা এখন এমনই। এর মধ্যে ৩৮টি খনন ও পুনঃখননের আওতায় আনতে তালিকা দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এগুলো খনন করা গেলে সেচ সুবিধার আওতায় আসবে কয়েক হাজার হেক্টর ফসলি জমি। বাড়বে মাছ ও ফসলের উৎপাদন। পাশাপাশি জলাবদ্ধতা থেকে উত্তরণ ঘটবে বলে মনে করছেন স্থানীয় লোকজন।

এমন সুবিধা দিতে বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার মোতাবেক সোমবার (১৬ মার্চ) দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার বলরামপুর সাহাপাড়া এলাকায় ১২ দশমিক ২ কিলোমিটার খাল পুনঃখননকাজ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে দেশের ৫৩টি এলাকায় এ কর্মসূচি চালু হবে। 

ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী এজেডএম জাহিদ হোসেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম, দিনাজপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, জাতীয় সংসদের হুইপ আখতারুজ্জামান মিয়াসহ জনপ্রতিনিধিরা একাধিকবার ওই এলাকা পরিদর্শন করেছেন। অনুষ্ঠানটি সফল করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে জেলা ও পুলিশ প্রশাসন। 

কর্মসূচির মাধ্যমে জেলার ৩৮টি খাল খনন ও পুনঃখনন কাজ শুরু হবে

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দুপুরে খাল পুনঃখননকাজ উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিনাজপুর জেলা শহরের ফরিদপুর কবরস্থানে তার নানা-নানি, খালার কবর জিয়ারত করবেন। বিকালে তিনি গোর-এ শহীদ ময়দানে জেলা বিএনপি ও প্রশাসনের আয়োজিত ইফতার মাহফিল ও সুধী সমাবেশে যোগদান করবেন। ইফতারের পর মাগরিবের নামাজ আদায় শেষে দিনাজপুর ত্যাগ করবেন।

কী পরিমাণ খাল খনন হবে দিনাজপুরে

দিনাজপুরে মোট খাল রয়েছে ৬৭টি। এর মধ্যে প্রাথমিকভাবে ৩৮টি খনন ও পুনঃখনন কাজের জন্য তালিকা দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড, যার পরিমাণ ৩১১ দশমিক ৪১ কিলোমিটার। এ কর্মসূচির মাধ্যমে জেলার ৩৮টি খাল খনন ও পুনঃখননকাজ শুরু হবে। আগামী জুন মাসের মধ্যে তিনটি খালের খনন কর্মসূচি সম্পন্ন হবে। 

যেসব খাল পুনঃখনন হবে

দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জুনের মধ্যে চিরিরবন্দর উপজেলার ভেলামতি আখিরাডাঙ্গা খালের ১৩ কিলোমিটার, খানসামা উপজেলার গাইনডোবা খালের ২ দশমিক ৫ কিলোমিটার এবং বিরামপুর উপজেলার করমপুর খাড়ির ১ দশমিক ৭ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করা হবে। পর্যায়ক্রমে সদর উপজেলার মহব্বতপুর খালের ৬ কিলোমিটার, চকগোপাল খালের ৬ কিলোমিটার, ঘাঘড়া খালের ৯ কিলোমিটার, গিজিরা খালের ৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার ও মুরাদপুর শাহপুকুর খালের ১ দশমিক ২ কিলোমিটার খনন ও পুনঃখনন হবে। 

আগামী জুন মাসের মধ্যে তিনটি খালের খনন কর্মসূচি সম্পন্ন হবে

বিরল উপজেলার সোনাইখাড়ি খালের ২ দশমিক ৬ কিলোমিটার, তেঘড়া মহেশপুর খালের ৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার ও সতিরঘাট খালের ২ কিলোমিটার খনন ও পুনঃখনন করা হবে। বোচাগঞ্জ উপজেলার নেহালগাঁও খালের ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার ও আলমপুর খালের ৩ কিলোমিটার খনন ও পুনঃখনন হবে। কাহারোল উপজেলার ডহুন্ডা খালের ৫ কিলোমিটার ও বোয়ালজিল খালের ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন হবে। বীরগঞ্জ উপজেলার পাথরঘাটা খালের ৮ দশমিক ৯ কিলোমিটার, নুটুরিপুটুরী ডারার ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার ও ছোট ঢেপা নদীর ১৩ কিলোমিটার খনন ও পুনঃখনন করা হবে। 

পাশাপাশি খানসামা উপজেলার বেলাননদীর ২২ কিলোমিটার ও মরানদীর ৬ কিলোমিটার খনন ও পুনঃখনন করা হবে। চিরিরবন্দর উপজেলার খোটাখারীর ৯ দশমিক ৫ কিলোমিটার, তাজপুর খালের ৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার, চিরিনদীর ১৭ কিলোমিটার ও গাওলডাঙ্গী খালের ১০ কিলোমিটার খনন ও পুনঃখনন হবে। ফুলবাড়ী উপজেলার তিলাইনদীর ৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার ও সতিরখালের ৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার খনন ও পুনঃখনন করা হবে। বিরামপুর উপজেলার ভেলারখালের ৮ কিলোমিটার, মাহমুদপুর খালের ৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার, পলিখাপুর জলাশয়ের দশমিক ৬২৫ কিলোমিটার, একোয়ার খালের ২ কিলোমিটার ও করমপুর খাড়ির ৬ দশমিক ৬ কিলোমিটার খনন ও পুনঃখনন করা হবে। 

এ ছাড়া ঘোড়াঘাটের ডুগডুগি খালের ১৫ কিলোমিটার ও জোড়াগাড়ী খালের ১১ কিলোমিটার খনন ও পুনঃখনন হবে। নবাবগঞ্জের নলশিশা খালের ২৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার, শালখদিয়া খালের ২০ কিলোমিটার ও মালদাহ খালের ৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার খনন ও পুনঃখনন হবে। হাকিমপুর উপজেলার তুলসীডাঙ্গা খালের ১৪ কিলোমিটার ও ছোট তুলসীডাঙ্গা খালের ৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার খনন ও পুনঃখনন হবে।

পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন

এ ব্যাপারে দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগ-২-এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মাহতাব আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘খাল খনন ও পুনঃখনন কাজের উদ্বোধনের মাধ্যমে সারাদেশে এ কর্মসূচি শুরু হবে। দিনাজপুরে মোট খাল রয়েছে ৬৭টি। এর মধ্যে ৩৮টি খনন ও পুনঃখননের জন্য তালিকা করে মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন ও বরাদ্দ সাপেক্ষে এসব খাল খনন ও পুনঃখনন কাজ বাস্তবায়ন করা হবে।’ 

দিনাজপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, ‘১৬ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিনাজপুরের সাহাপাড়া খালটি পুনঃখননের মধ্য দিয়ে এ কাজের উদ্বোধন করবেন। একই সঙ্গে দেশের ৫৩টি এলাকায় এ কর্মসূচি শুরু হবে।’

তিনি বলেন, ‘এর মাধ্যমে খালের নাব্যতা বৃদ্ধি, পানি নিষ্কাশন সহজ করা, পানি ধরে রেখে শুকনা মৌসুমে ব্যবহার করা যাবে। মাছ চাষ, হাঁস পালন, খালের দুই পাশে পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণও করা হবে। পাড়গুলো টেকসই হবে এবং পরিবেশও রক্ষা পাবে। পানির জন্য কৃষির উন্নয়ন হবে। ধান, ভুট্টা, আলু, রবিশস্য ভালো হবে। সবমিলিয়ে এই এলাকার সাড়ে তিন লাখ মানুষ পানি ব্যবহার করতে পারবে এবং এর সুফল পাবে। ডিজিপিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। মানুষকে অর্থনীতিকভাবে স্বাবলম্বী করা এবং কৃষির উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। ভুগর্ভস্থ পানির কম ব্যবহার হবে। ওপরের পানি বেশি ব্যবহার হবে। মরুভূমি হওয়ার আশঙ্কা কমে যাবে। আমাদের উত্তরাঞ্চলের জন্য এটা খুবই জরুরি।’

খাল খনন ও পুনঃখনন কাজের উদ্বোধনের মাধ্যমে সারাদেশে এ কর্মসূচি শুরু হবে

যা বলছেন পানিসম্পদমন্ত্রী

পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, ‘খাল খনন কর্মসূচি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একটা আন্দোলন। আমরা তারেক রহমানের নেতৃত্বে আবারও এ কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। দীর্ঘদিন খাল খনন বা পুনঃখনন প্রক্রিয়া বন্ধ ছিল। অনেক জায়গায় পলি জমে ছিল। খাল খনন অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ দেশের জন্য।’

পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ‘এই খাল খননের মাধ্যমে জনগুরুত্বপূর্ণ এবং জনদাবি পূরণ হবে। এই কর্মসূচির কাজ শেষ হলে এলাকার সাধারণ মানুষ সুবিধা পাবে। এখানে প্রচুর জলাবদ্ধতা হয়। এই খালটা খননের মধ্য দিয়ে জলাবদ্ধতা দূর হবে। খালের পানি যখন সেচপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে খেতে যাবে, সেখানে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।’

খনন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সম্পূর্ণভাবে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সব কিছু মাথায় রেখে যে কাজটুকু করবো সেটি পর্যবেক্ষণ রাখবো। কোনোভাবেই যাতে দুর্নীতি না হয় সেদিকে আমাদের বিশেষ নজর থাকবে। জনস্বার্থে আমরা এ কাজ করবো। সেখানে পুরোপুরি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবো।’