কলার মোচা দেখিয়ে ট্রেন থামালেন দিনমজুর, দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা

দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলায় সকালে বাড়ির সামনে রেললাইনের পাশ দিয়ে হাঁটছিলেন দিনমজুর এনামুল হক (৬২)। সামনে এগোতেই চোখে পড়ে রেললাইনের প্রায় এক হাত অংশ ভাঙা। বিষয়টি নিকটবর্তী রেলস্টেশনে জানাতে গ্রামের এক যুবককে কল দেন। তখন দেড় কিলোমিটার দূরে ট্রেনের হুইসেল বাজছিল। ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। তিনি আশপাশে খুঁজতে থাকেন লাল রঙের কাপড়।

লাল কাপড় না পেয়ে দৌড়ে রেললাইনের পাশের কলাক্ষেতে যান এনামুল। তড়িঘড়ি করে কলাগাছ থেকে কলার মোচা ছেঁড়েন। এরপর মোচা থেকে লাল রঙের বড় খোসা খুলে লাঠির মাথায় দড়ি দিয়ে বাঁধেন। এটি লাল নিশানের মতো উঁচিতে রেললাইনের পাশে দাঁড়ান। পাঁচ মিনিট পর সামনে দক্ষিণ দিক থেকে আসা দ্রুতগামী পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেন লাল নিশান দেখে থেমে যায়। এনামুল হকের এমন বুদ্ধিমত্তায় বড় ধরনের দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পায় ট্রেনটি। তাকে সাধুবাদ জানাতে হাততালি দেন ট্রেনের যাত্রীরা।

সোমবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে উপজেলার পূর্ব চণ্ডীপুর গ্রামে রেললাইনে এ ঘটনা ঘটে। দিনমজুর এনামুল হক উপজেলার পূর্ব চণ্ডীপুর গ্রামের মৃত ফজলুল হক সোনারের ছেলে। তিনি পেশায় দিনমজুর। ট্রেনটি দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়ায় এলাকায় প্রশংসায় ভাসছেন এনামুল হক।

এনামুল হক বলেন, ‘সকালে রেললাইন দিয়ে হাঁটার সময় রেললাইনের ভাঙা অংশ দেখে চমকে উঠেছি। দূরোত থাকি ট্রেনের হুইসেল শুনে ঠিক থাকপার পারি নাই। কীভাবে ট্রেনটি দুর্ঘটনা থেকে বাঁচামো এই চিন্তায় রেললাইনের পাশে দৌড়াদৌড়ি করছিলাম। রেললাইনের পাশের কলাবাগান থাকি কলার মগজ (মোচা) ছিঁড়ে লাল বাকল (খোসা) দিয়ে লাঠিতে বান্ধি (বেঁধে) নিশানা করে সিগনাল দিছি। আমার সামনে ট্রেনটি থামার পর আমার খুব ভালো লাগিছে। ম্যালাগুলা মানষের জীবন বাঁচলো।’

পূর্ব চণ্ডীপুর গ্রামের বাসিন্দা সোহাগ রানা বলেন, ‌‘এনামুল চাচা অত্যন্ত সহজ-সরল মানুষ। তার মানবিক চিন্তা ও বুদ্ধিমত্তায় ট্রেনটি বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেলো। শত শত যাত্রী মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেলো।’

ফুলবাড়ী রেলস্টেশনের মাস্টার শওকত আলী জানান, সকালে বিরামপুরের পূর্ব চণ্ডীপুর এলাকায় রেললাইনের একটি অংশ ভাঙা দেখে স্থানীয় এক ব্যক্তি তাকে খবর দেন। পরে বিষয়টি তিনি রেলওয়ের পার্বতীপুর প্রকৌশলী দপ্তরকে জানান। সেখানকার লোকজন ঘটনাস্থলে গিয়ে ফুলবাড়ী-বিরামপুর রেলওয়ের ৩৫২/৫ থেকে ৩৫২/৬ নম্বর মাইলপোস্টের মাঝামাঝি অংশে রেললাইনের ওই ভাঙা অংশটি মেরামত করেন। পরে আধা ঘণ্টা দেরিতে পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেনটি পঞ্চগড়ের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। এনামুল হকের এই মানবিক কাজের কারণে ট্রেনটি দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছে। ট্রেন চলাচলের সময় অতিরিক্ত চাপে হয়তো রেললাইনের ওই অংশ ভেঙে গেছে। রেললাইন মেরামতের পর থেকে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক আছে।

পার্বতীপুর রেল বিভাগের ঊর্ধ্বতন সহকারী প্রকৌশলী রাকিব হাসান জানান, পার্বতীপুর-সান্তাহার পথের ২৪ কিলোমিটার পথে রেললাইন ভাঙার ঘটনা এখন নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৪৩ সালে নির্মিত রেললাইন এখনো ব্যবহার করা হচ্ছে ওই পথে। ৯০ পাউন্ডের রেললাইন গুলো অনেক আগেই মেয়াদ উর্ত্তীর্ণ হয়ে গেছে।  ১২০ পাউন্ডের রেললাইন বসানো হলে লাইন ভাঙা রোধ করা সম্ভর হবে। বিষয়টি নিরসনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। তারা প্রযোজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।