ট্যাংকলরি শ্রমিকরা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে কাজে যোগদান করেছেন। দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেলহেড ডিপো থেকে উত্তরের ৮ জেলায় তেল সরবরাহ শুরু হয়েছে। এরপরও দিনাজপুরে জ্বালানি তেলের সংকট যেন কাটছেই না। তেল না পেয়ে মোটরসাইকেলসহ যানবাহনের লাইন দীর্ঘ হচ্ছে, বাড়ছে গ্রাহকদের হয়রানি।
রবিবার (২৯ মার্চ) রাত থেকেই উত্তরের ৮টি জেলায় তেল সরবরাহের কাজে যোগদান করেছেন কর্মবিরতিতে থাকা শ্রমিকরা। তবে দীর্ঘসময় কর্মবিরতির ফলে জটলা বেধেছে। রবিবারে যেসব পাম্পে তেল পৌঁছানোর কথা ছিল সেগুলো পৌঁছেছে গভীর রাতে। ট্যাংকলরি শ্রমিকদের কর্মবিরতির ফলে ডিপো থেকে জ্বালানি তেল সঠিক সময়ে পৌঁছায়নি না পাম্পগুলোতে। এতে সংকট আরও বেড়েছে। এমন অবস্থায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ গ্রাহকরা।
দিনাজপুর মডার্ন মোড় এলাকার রহমান ব্রাদার্স ফিলিং স্টেশনে গিয়ে কথা শরিফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, গত কয়েকদিন ধরেই তেল সংকট চলছে। দীর্ঘলাইনে দাঁড়িয়েও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। আবার পাওয়া গেলেও চাহিদা মাফিক না। ২০০ টাকার তেল পেয়েছি ৫ দিন আগে। আমি তো চাকরিজীবী, কাজ বাদ দিয়ে লাইনেও দাঁড়াতে পারি না।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমি একটি এনজিওতে চাকরি করি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ডিউটি। কখন তেল দেবে এই খোঁজ তো রাখতে পারি না। এখন এই পাম্পে এসে দেখি তেল দিচ্ছে না। কোন পাম্পে দেওয়া হবে সেটিও কেউ বলতে পারছে না। তেল না পেলে আমি আমার কাজ ঠিকভাবে করতে পারছি না। এভাবে কি চলে বলেন?
রফিকুল ইসলাম বলেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে পাওয়া যাচ্ছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার তেল। সেটি দিয়ে কদিন চলে? এভাবে রিলিফের মতো করে তেল নিতে হচ্ছে। এখন আমাদের যান্ত্রিক জীবন, মোটরসাইকেলের ওপর ভরসা করা ছাড়া উপায় নাই।
দিনাজপুর শহরের সুইহাড়ী পেট্রোল পাম্পে গিয়ে দেখা গেছে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি। সেখানে কথা হয় কাটাপাড়া এলাকার মিলন রায় বলেন, আমার মেয়েকে সকাল ৭টায় স্কুলে দিতে হয়। এত সকালে অটো পাওয়া যায় না। আবার আমার দোকান ব্যবসার জন্য এদিকে, ওদিকে যেতে হয়। মোটরসাইকেল ছাড়া তো হয় না। অটো ভাড়া দিয়ে কি জীবন চলবে? সকাল ৮টায় এখানে এসেছি, কিন্তু তেল দেওয়া হচ্ছে না। এভাবেই দাঁড়িয়ে আছি।
বিপ্লব বলেন, আমি জব করি, তেল আমার প্রয়োজন। ভোর ৫টা ৫৫ মিনিটে এখানে এসেছি। আমাদের বলা হয়েছে তেল দেওয়া হবে এজন্য এখানে অপেক্ষা করছি। এখন বেলা ১১টা, তেলের খবর নাই। অনেকেই আছেন যাদের প্রয়োজন, কিন্তু অনেকেই আছেন যাদের প্রয়োজন নাই। এই যাদের প্রয়োজন নাই, তারাই মূলত সমস্যা করছে।
জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমি এখানে এসেছি সাড়ে ৯টায় এসেছি। শুনেছিলাম বেলা ১১টায় দেবে। পরে শুনলাম বিকাল ৩টা, আবার শুনছি বিকেল ৫টায় দেবে। কখন দিবে জানি না। তবে ৫০০ টাকা করে দেবে শুনলাম। বেশি করে তেল দিলে এবং প্রতিটি পাম্পেই যদি একইসঙ্গে তেল দেওয়া হয় তাহলে কোনও সমস্যা থাকবে না।
রহমান ব্রাদার্স ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার জাহিদুল ইসলাম বলেন, সোমবার সকালে এই পাম্পে তেল আসার কথা ছিল। কিন্তু ট্যাংকলরি শ্রমিকদের কর্মবিরতির কারণে সেই তেল পৌঁছায়নি। কখন পৌঁছাবে সেটিও ঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। এ জন্য এই পাম্প থেকে পেট্রোল ও অকটেন তেল দেওয়া হচ্ছে না। তবে এই পাম্প থেকে ডিজেল সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।
রংপুর বিভাগীয় ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আতাউর রহমান জানান, তেল পরিবহনের কাজে নিয়োজিত ট্যাংকলরি চালকসহ তিন জন শ্রমিককে ভ্রাম্যমাণ আদালতে জেল-জরিমানার প্রতিবাদে রবিবার সকাল থেকে রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি শুরু করে ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়ন। এতে করে পার্বতীপুর রেলহেড অয়েল ডিপো থেকে উত্তরের ৮টি জেলায় জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। তবে রবিবার বিকালে জেল হাজতে পাঠানো তিন শ্রমিককে মুক্তি দেওয়া এবং নীলফামারীর এনডিসি নিয়াজ ভূঁইয়াকে অপসারণ করা হবে এমন আশ্বাস দেয় প্রশাসন। প্রশাসনের আশ্বাসের ভিত্তিতে শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে আন্দোলন কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। রবিবার সন্ধ্যা থেকেই ট্যাংকলরির স্লিপ দেওয়া শুরু হয়েছে এবং উত্তরের ৮টি জেলায় জ্বালানি তেল সরবরাহ শুরু হয়ে গেছে। এখন পুরোদমে ট্যাংকলরিগুলো পাম্পগুলোতে তেল সরবরাহ করছে।