দুর্ঘটনাময় জীবন রানা প্লাজা থেকে বেঁচে ফেরা সেই নাসিমার!

২০১৩ সালে রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় ধসে পড়া বহুতল ভবনের নিচ থেকে তিন দিন পর জীবিত উদ্ধার হয়েছিলেন দিনাজপুরের পার্বতীপুরের নাসিমা বেগম (৪০)। কিন্তু রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায় ফেরিঘাটে বাস দুর্ঘটনায় ভাগ্য তার সহায় হয়নি। দুর্ঘটনার পর পানি থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এই দুটি ঘটনাই নয়, নাসিমা বেগমের জীবনটাই যেন ছিল শুধুই দুর্ঘটনাময়। রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় দেড় লাখ টাকা আর বাস দুর্ঘটনায় ৫০ হাজার টাকা ছাড়া মেলেনি আর কোনও সহায়তা।

২০০২ সালের দিকে তার বাবা আব্দুল সাত্তার মারা গিয়েছিলেন বাস দুর্ঘটনায়। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ার পর পারিবারিক কলহে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়। ২০১৩ সালে রানা প্লাজায় কাজ করার সময় দুর্ঘটনার পর ভবনের ভেতর আটকে পড়েন নাসিমা। তিন দিন পর মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। গুরুতর আহত হওয়ায় আর ঢাকায় কাজে ফেরা হয়নি। বাড়িতে থাকাকালে অবস্থায় ২০২৪ সালে লিভারে সমস্যায় মারা যান দ্বিতীয় স্বামী নূর ইসলাম। অবশেষে গত ২৫ মার্চ রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটে বাস দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান নাসিমা। তার লাশ বাড়িতে আনার সময় বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সও পড়ে দুর্ঘটনার কবলে।

বাস দুর্ঘটনার এক মাস হয়ে গেলেও মাত্র ২৫ হাজার টাকা ছাড়া সরকারি কোনও সহযোগিতা বা ক্ষতিপূরণ পায়নি নাসিমার পরিবার। তার একমাত্র ছেলে ‘এখন দিন আনে দিন খায়’।

নাসিমা বেগম (৪০) দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলায় ৪ নম্বর পলাশবাড়ী ইউনিয়নে মধ্য আটরাই গ্রামের মৃত নুর ইসলামের স্ত্রী।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নাসিমার পরিবারে এক সন্তান ছাড়া আর কেউ নেই। ছেলে নাসিরুল ইসলাম ঢাকার একটি গার্মেন্টে আয়রনম্যান পদে চাকরি করেন। ৪ বছর আগে নাসিরুল ইসলামের বিয়ে হয়। তার সংসারে প্রায় তিন বছর বয়সী এক ছেলে সন্তান রয়েছে। স্ত্রী আর সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় থাকেন নাসিরুল। আর নাসিমা থাকতেন তার বোন সানোয়ারা খাতুনের সঙ্গে।

নাসিমার চাচাতো ভাই জুলফিকার আলী ভুট্টু বলেন, তাদের জমিজমা কিছু নাই। বোনের বাড়িতে থাকতো। প্রথমে আমার বাড়িতেই থাকতো। পরে সে বোনের বাড়িতে বসবাস শুরু করে। বোনের জমি আছে চার শতকের মত। সেখানেই থাকতো। তারা একেবারে এতিম। অল্প বয়সেই বিয়ে হয়। এরপর এক ছেলে সন্তান জন্ম নেয়। পরে সেই স্বামীর সঙ্গে পারিবারিক কলহের কারণে ডিভোর্স হয়ে যায়। পরে নূর ইসলামের সঙ্গে বিয়ে হয় নাসিমার।

তিনি বলেন, রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় নাসিমার অঙ্গহানি হয়নি। তিন দিন ইটের নিচে চাপা পড়ে ছিল। এ জন্য গুরুতর অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল। ঢাকায় চিকিৎসা দেওয়ার পর আবারও রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এক মাস চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপর সুস্থ হয়ে ওঠে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় এক লাখ ৫০ হাজার টাকা পেয়েছিল। সেই টাকা স্বামীকে দিয়ে বাড়ির কাজ করেছিল।

জুলফিকার আলী ভুট্টু জানান, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার সময় সেখানে কর্মরত ছিল নাসিমা। ধসে পড়া বহুতল ভবনের নিচ থেকে তিন দিন পর জীবিত উদ্ধার হয়েছিল। স্বামীর মৃত্যুর পর জীবিকার তাগিদে চাকরির জন্য ঢাকা যাওয়ায় তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। এবারের বাস দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পর সরকারিভাবে ২৫ হাজার টাকা দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। আর পার্বতীপুরের সন্তান হওয়ায় কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক ব্যক্তিগতভাবে দিয়েছিলেন ২৫ হাজার টাকা। দুর্ঘটনার দিনই আমরা ৫০ হাজার টাকা পেয়েছিলাম। এরপর আর কোনও ক্ষতিপূরণ বা আর্থিক সহযোগিতা করা হয়নি।

ছেলে নাসিরুল ইসলামের স্ত্রী মুক্তা বানু বলেন, আমার স্বামী একটা চাকরি করে। কোনও জায়গা-জমি কিছু নাই। এ জন্য ঢাকায় এসে কাজ করে খাই। তিনি ১৫-২০ হাজার টাকার মতো বেতন পান। সেই টাকা দিয়েই টানাটানির সংসার। দুর্ঘটনার দিন আমাদেরকে ২৫ হাজার করে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল। এরপর একদিন আমাকে ফোন দেওয়া হয়েছিল। বলেছিল একজন ম্যাডাম ফোন দেবেন যা জিজ্ঞাসা করবেন তার যেন সঠিক উত্তর দেই। কিন্তু আমাকে আর কোনও ফোন দেওয়া হয়নি। আমাদের অসহনীয় কষ্ট, যদি সহযোগিতা করতো তাহলে বেশ উপকারই হতো।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে ধসে পড়া বহুতল ভবন রানা প্লাজার নিচ থেকে তিন দিন পর জীবিত উদ্ধার হয়েছিলেন দিনাজপুরের পার্বতীপুরের নাসিমা বেগম। এরপর তিনি দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। বাড়িতেই থাকতেন। দুই বছর আগে তার স্বামী মারা গেলে তিনি বোনের বাড়িতে ওঠেন। কিন্তু বোনেরও তেমন সচ্ছলতা নেই, মাত্র চার শতক জমির ওপর বাড়ি ছাড়া কিছুই নাই। সংসার চালানোর জন্য স্বামী হারা নাসিমা গত ১৯ ফেব্রুয়ারি চাকরির উদ্দেশে ঢাকার সাভারে ভাগ্নি আজমিরা খাতুনের বাড়িতে যান। এক মাসের চেষ্টার পরও চাকরির ব্যবস্থা না হওয়ায় ঈদ করতে ভাগ্নির শ্বশুরবাড়ি ফরিদপুরে যান।

ঈদ শেষে ২৫ মার্চ বিকাল ৫টায় বাসযোগে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া পাটুরিয়া ফেরি ঘাট দিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা করেন নাসিমা খাতুন, ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ভাগ্নি আজমিরা খাতুন ও তার চার বছরের শিশু সন্তান আব্দুর রহমান এবং আজমিরার স্বামী আব্দুল আজিজ আজাদ। এরপর তাদের বাসটি পড়ে যায় পদ্মা নদীতে। কিছুক্ষণ পর ভেসে উঠে ভাগ্যক্রমে প্রাণে বাঁচেন শুধুমাত্র আব্দুল আজিজ। এর প্রায় ছয় ঘণ্টা পর রাত সাড়ে ১১টার দিকে নানি, ভাগ্নি ও নাতির লাশ উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

আইনি সব কার্যক্রম শেষ করে লাশ নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সযোগে পার্বতীপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন নাসিমার স্বজনরা। পথিমধ্যে রাত ৯টার দিকে কুষ্টিয়া পার হয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে (চলন্ত গাড়ির চাকা ব্লাস্ট হয়ে যায়) লাশবাহী গাড়িটি। পরে মেরামত শেষে তার লাশ বাড়িতে পৌঁছায়। পরের দিন দুপুরে তার জানাজা শেষে দাফন করা হয়।