বাধার মুখে গাইবান্ধায় ‘এশিয়ার সর্ববৃহৎ’ রামমূর্তি নির্মাণ স্থগিত

গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে আলোচিত ‘বৃহত্তম রামমূর্তি’ স্থাপন ও নির্মাণের কাজ আপাতত স্থগিত ঘোষণা করেছে শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির কমিটি। বিপুল পরিমাণ অর্থ ও অর্থের উৎস নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠায় এবং এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।

সংবাদ সম্মেলনে মন্দির কর্তৃপক্ষ জানায়, রামমূর্তি নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহল থেকে নানা ধরনের প্রশ্ন, মতামত ও প্রতিবাদ উঠে এসেছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট রাখা এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে এই মন্দিরের নির্মাণকাজ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে প্রশাসন, রাজনৈতিক দল কিংবা কোনও পক্ষের চাপের মুখে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

মন্দির কমিটির নেতারা বলেন, আমরা বাঙালি। সকল ধর্মের মানুষের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে বিশ্বাস করি। ভবিষ্যতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। তবে মন্দিরের নিয়মিত ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রম চলমান থাকবে।

এদিকে, পলাশবাড়ীতে নির্মাণাধীন ‘এশিয়ার সর্ববৃহৎ রামমূর্তি’ অপসারণের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে ইমাম-উলামা পরিষদ। বিকালে উপজেলা মডেল মসজিদের হলরুমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতারা মূর্তি নির্মাণ কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ এবং সংশ্লিষ্ট সকল উদ্যোগ বাতিলের দাবি জানান।

বুধবার (১০ জুন) উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার লক্ষ্যে এক সম্প্রীতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। উপজেলা পরিষদ হলরুমে অনুষ্ঠিত ওই সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ জাবের আহমেদ। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গাইবান্ধা-৩ (পলাশবাড়ী-সাদুল্লাপুর) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ আবুল কাওছার মো. নজরুল ইসলাম (লেবু)। সমাবেশে বক্তারা গুজব, উসকানি ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা থেকে বিরত থেকে শান্তি, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানান।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নে রামমূর্তি নির্মাণ বন্ধের দাবিতে বুধবার বিকালে স্থানীয় পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। ইমাম উলামা পরিষদ গাইবান্ধা জেলা শাখা ও জেলার সর্বস্তরের সচেতন নাগরিক সমাজ এই সম্মেলনের আয়োজন করে। এর আগে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে আট দফা দাবি সংবলিত একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।

ইমাম উলামা পরিষদ গাইবান্ধা জেলা সেক্রেটারি মুফতি মানছুর রহমান খান লিখিত বক্তব্যে বলেন, আমরা জেলার আলেম, উলামা, ইমাম, খতিব, শিক্ষক, ছাত্র-জনতা ও সর্বস্তরের সচেতন নাগরিকবৃন্দ গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সাথে লক্ষ্য করছি যে, পলাশবাড়ী হোসেনপুর ইউনিয়নে একটি বৃহৎ রামমূর্তি নির্মাণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জনশ্রুতি অনুযায়ী এটি বিশ্বের সর্ববৃহত্তম রামমূর্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। 

বিষয়টি ইতোমধ্যে স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা, উদ্বেগ, ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতায়র অনুভুতি সৃষ্টি করেছে। রংপুর বিভাগের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর অঞ্চলে এত বৃহৎ পরিসরে, মন্দিরের বাহিরে রিসোর্ট স্পট বানিয়ে সেখানে প্রকাশ্যে মূর্তি নির্মাণকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, সামাজিক অস্থিরতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ কারণে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি। 

রামমূর্তি নির্মাণ বন্ধের দাবিতে বুধবার বিকালে স্থানীয় পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করা হয়

প্রকল্পের উদ্যোক্তা হরিদাস চন্দ্র সম্পর্কে বিভিন্ন মহলে নানা অভিযোগ, বিতর্ক ও প্রশ্ন বিদ্যমান রয়েছে। তার বিরুদ্ধে অতীতে উগ্রবাদী আচরণ বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আছে। এসব অভিযোগের সত্যতা ও প্রকৃত অবস্থা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। 

৮ দফা দাবিগুলো হলো- নির্মাণাধীন ওই বৃহৎ রামমূতি প্রকল্পের সকল কার্যক্রম বন্ধ করে প্রকল্পটির অর্থায়নের উৎস, ব্যয়ের পরিমাণ, দেশি-বিদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা এবং আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত পরিচালনা করার দাবি জানান। সেইসাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব, সম্পদের উৎস, আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত তথ্যাদি আইনানুগভাবে তদন্ত ও নিরীক্ষার আওতায় আনা, কোনও বিদেশি রাষ্ট্র, সংস্থা বা ব্যক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অর্থায়ন, প্রভাব বা সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা তা গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা, প্রকল্পটিকে কেন্দ্র করে দেশের সার্বভৌমম্ব, জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সাম্প্রদায়িকতা সম্প্রীতির জন্য কোনও ঝুঁকি রয়েছে কিনা তা বিশেষভাবে তদন্ত করা হোক, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রচলিত অভিযোগসমূহ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা, ওই প্রকল্পের সঙ্গে বিদেশি কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ বা আলোচনা সত্য কিনা তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে যাচাই করা হোক, তদন্তে যদি কোনও বিদেশি হস্তক্ষেপ, অনভিপ্রেত প্রভাব বিস্তার বা কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বিদেশি মিশনের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ ও ব্যাখ্যা চাওয়ার ব্যবস্থা করা এবং গাইবান্ধা জেলা ও রংপুর বিভাগের শান্তি-শৃংখলা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমম্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় সকল কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। 

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন ইমাম উলামা পরিষদের জেলা সভাপতি মুফতি মাহমুদুল হাসান কাসেমী। সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন হেফাজতে ইসলাম জেলা সভাপতি আব্দুল বাসেত, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জেলা সভাপতি আব্দুল মাজেদ, খেলাফত মজলিস জেলা সভাপতি মুফতি ইউসুফ কাসেমী, পলাশবাড়ী উলামা পরিষদের সভাপতি ছাদেকুল ইসলাম প্রমুখ।