চার দিন পেরিয়ে গেলেও কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার গয়টাপাড়া সীমান্তের শূন্যরেখায় দুই শিশু সন্তানসহ আটকে থাকা বেলাল হোসেন-সুমি আক্তার দম্পতি ও অপর দুই যুবকের বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বুধবার (১৭ জুন) সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা পূর্বের অবস্থানেই আটকে রয়েছেন। সীমান্তের শূন্যরেখায় তাদের জন্য শুধু সীমাহীন শূন্যতা বিরাজ করছে।
গত রবিবার (১৪ জুন) ভোর ৬টার দিকে উপজেলার গয়টাপাড়া সীমান্তপথে নারী-শিশুসহ ছয় জন এবং ইজলামারী সীমান্তপথে আরও তিন জনকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পুশইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। কাঁটাতারের এপারে বাংলাদেশ প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হলেও বিজিবি এবং স্থানীয় গ্রামবাসীর বাধায় তাদের বাংলাদেশ ভূখণ্ডে পাঠাতে পারেনি তারা। এখনও নারী-শিশুসহ ভুক্তভোগীরা সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন।
বুধবার গয়টাপাড়া সীমান্তে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মঙ্গলবার দিনভর তাপদহ শেষে রাতে বৃষ্টি নামে। বুধবার সকাল থেকে ফের রোদ আর গরম। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মাথার ওপর একটি পলিথিন ঝুলিয়ে দুই শিশুসন্তান নিয়ে ওই দম্পতি অবস্থান করছেন। ভারতীয় প্রান্তে বিএসএফ আর বাংলাদেশ প্রান্তে বিজিবি তাদের ঘিরে কঠোর নজরদারিসহ পাহারায় দাঁড়িয়ে আছে। পাহারায় নিযুক্ত জওয়ানদের রদবদল হলেও চার দিন ধরে শিশুসন্তানসহ দম্পতির অবস্থানের কোনও পরিবর্তন হয়নি। বিএসএফের বেআইনি পুশইন আর বিজিবির সীমান্ত আইনের ‘দোহাই’ তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। তারা ন্যূনতম মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সুমি-বেলাল দম্পতির দাবি, তারা বাংলাদেশের ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বিরুনিয়া ইউনিয়নের কংশেরকুল গ্রামের বাসিন্দা। কয়েক সপ্তাহ আগে সিলেট সীমান্তপথে তারা ভারতে পাড়ি জমান। পরে গোহাটি পুলিশের হাতে আটক হলে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বিএসএফ গত রবিবার ভোরে তাদেরকে সীমান্তের কাঁটাতার পার করে দেয়। কিন্তু বিজিবি ও স্থানীয়দের বাধায় তারা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে পারেননি। সেই থেকেই শূন্যরেখার কাছে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
এদিকে কখনও বৃষ্টি আবার কখনও গরম আবহাওয়ায় দুই শিশুসন্তানের সুস্থতা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সুমি-বেলাল দম্পতি। সন্তানদের কথা বিবেচনা করে তাদের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে দুই রাষ্ট্রের সরকারের প্রতি অনুরোধ তাদের।
শিশুসন্তানদের জীবন বাঁচাতে আকুতি জানিয়ে মা সুমি আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জমির মাঝে খোলা জায়গায় এভাবে আর কতদিন থাকা যায়। কোনও দিকে যাওয়া যায় না। বৃষ্টি আর গরমে অসুস্থ হয়ে বাচ্চাগুলা মরে যাবে। ওদের জীবন দুইটা আর মুখের দিকে তাকায় আমাদের এখান থেকে সরাই নেন।’
বিজিবি জানায়, বিএসএফ সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে রৌমারীর দুই সীমান্তপথে ৯ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। ঠেলে দেওয়া ব্যক্তিরা কাঁটাতারের এপারে শূন্যরেখার কাছে ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থান করলেও তাদের ফেরত নেয়নি বিএসএফ। এটা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। বিজিবিও তাদেরকে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে দেয়নি।
বিজিবি আরও জানায়, পুশইন চেষ্টার পরপর রবিবার দুপুরে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক হয়। তবে কোনও সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়। এরপর মঙ্গলবার রাতে সীমান্ত পরিস্থিতি পরিদর্শনে বিজিবি ও বিএসএফের ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীলরা ঘটনাস্থলে যান। তবে কোনও পক্ষ থেকে কোনও সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
বিজিবি ৩৫ ব্যাটালিয়নের গয়টাপাড়া ক্যাম্প কমান্ডার সুবেদার শফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঠেলে দেওয়া ব্যক্তিরা শূন্যরেখার কাছে পূর্বের অবস্থানেই আছেন। বৃষ্টি হয়েছিল। তারা পলিথিনের ছাউনির নিচে রয়েছে। রোদ আর গরমে তাদের কষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে দুই শিশুর সমস্যা হচ্ছে। কখনও বিএসএফ আবার কখনও স্থানীয় লোকজন তাদের খাবার দিচ্ছে।’
‘মঙ্গলবার রাতে বিজিবি ও বিএসএফের ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীলরা ঘটনাস্থলে এসে দেখে গেছেন। তবে এখন পর্যন্ত (বুধবার বিকাল) নতুন কোনও নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। বিজিবির পক্ষ থেকে পাহারা বজায় রয়েছে।’ যোগ করেন ক্যাম্প কমান্ডার শফিকুল।
তবে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কোনও পর্যায়ের দায়িত্বশীলরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
/এএম/