রংপুরে হোটেলের ছাদ থেকে লাফিয়ে কিশোরীর ‘আত্মহত্যা’, মেডিক্যাল শিক্ষার্থী আটক

বিভাগীয় নগরী রংপুরে সেন্ট্রাল রোড এলাকায় অভিজাত হোটেল নর্থভিউয়ের ১০ তলার ছাদ থেকে লাফিয়ে এইচএসসি পরীক্ষার্থী নুজশাত (১৭) আত্মহত্যার ঘটনায় নতুন মোড় নিয়েছে। পুলিশ তার কথিত প্রেমিক রংপুর মেডিক্যাল কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আহম্মেদ সাকিনকে গ্রেফতার করার পর ঘটনার জট খুলতে শুরু করেছে। তার বাড়ি রংপুর নগরীর ধাপ চিকলী ভাটা এলাকায়। তার বাবার নাম ফোরকান আলী।

এদিকে কলেজ ছাত্রী নুজশাত নিহত ঘটনায় তার বাবা নুরল ইসলাম নিজেই বাদী হয়ে মেডিক্যাল কলেজ শিক্ষার্থী সাকিনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও চার থেকে পাঁচ জনকে আসামি করে তার মেয়েকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ এনে রংপুর মেট্রোপলিটন কোতয়ালি থানায় মামলা দায়ের করেছে।

উল্লেখ্য, রংপুর নগরীর সেন্ট্রাল রোড এলাকায় অবস্থিত অভিজাত হোটেল নর্থভিউয়ের ১০ তলার ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে এইচএসসি পরীক্ষার্থী নুজশাত (১৭) আত্মহত্যা করে। সোমবার বিকেল ৫টা ৪২ মিনিটে এ ঘটনা ঘটে।

এদিকে হোটেলের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পড়ে যাওয়ার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় নগরী জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। নুজশাতের বাড়ি রংপুর নগরীর খলিফাপাড়া মহল্লায়। তার বাবার নাম নুরল ইসলাম, মায়ের নাম আফসানা পারভীন লীনা। সে রংপুর ক্যান্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রী এবং এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিল বলে জানা গেছে।

পুলিশ জানায়, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে মেয়েটি বিকেল ৫টার আগে নর্থভিউ হোটেলে আসে। এরপর সে হোটেলের ১০ তলার ছাদে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ অবস্থান করে। সেখানে বেশ কিছুক্ষণ মোবাইল ফোনে কথা বলে। এরপর বিকেল ৫টা ৪২ মিনিটে নুজশাত নর্থভিউ হোটেলের ১০ তলার ছাদের গ্রিলের উপর উঠে নিচে লাফ দেয়, এতে ঘটনাস্থলেই সে নিহত হয়।

এদিকে সন্তানের আত্মহত্যার খবর পেয়ে তার বাবা নুরল ইসলাম, মা আফসানা পারভীনসহ স্বজনরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তারা জানান, কোচিং করতে বাসা থেকে বের হয়েছিল, কীভাবে নর্থভিউ হোটেলে আসলো এবং কে তার সঙ্গে ছিল— বিষয়টি প্রশ্ন করে দেখার অনুরোধ জানান।

পুলিশ জানায়, কলেজ ছাত্রী নুজশাত ১০ তলা ভবনের ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করার আগে তার মোবাইল ফোনটি ফেলে রেখে যায়। ওই ফোনের কল লিস্টের সূত্রে তার প্রেমিক মেডিক্যাল কলেজ শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আহম্মেদ সাকিনকে সোমবার রাতে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে এক পর্যায়ে সে স্বীকার করে গত ৯ মাস ধরে নুজশাতের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ হতো বলে পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়।

তবে পুলিশের হাতে আটকের পর শাহরিয়ার আহম্মেদ সাকিন গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, নিহত কলেজছাত্রী নুজশাত জাহান তার শিক্ষার্থী ছিলেন। চারজনের ব্যাচে তাকে প্রাইভেট পড়াতেন। ওই শিক্ষার্থী তাকে পছন্দ করতেন বুঝতে পেরে তিনি আলাদা করে দেন। কিন্তু নুজশাতের মায়ের অনুরোধে পরে তাকে আরেকটি ব্যাচে পড়ানো শুরু করেন।

সাকিন আরও জানান, নুজশাত তাকে পছন্দ করার কারণে বিভিন্ন সমস্যার কথা বলে হোয়াটসঅ্যাপে কল ও মেসেজ করতেন। এরপর নুজশাতের নম্বর ব্লক করে রাখেন তিনি। মৃত্যুর এ ঘটনার জন্য দায়ী নন বলে দাবি করেন তিনি।

নিহত কলেজছাত্রীর পরিবারের অভিযোগ

নিহত শিক্ষার্থী নুজশাতের মা আফসানা পারভীন অভিযোগ করেন, তার মেয়ে প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। কখন, কীভাবে, কেন হোটেলের ছাদে গেলেন সে বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না। তিনি মেয়ের মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করে জড়িতদের শাস্তির দাবি জানান।

বাবা আনোয়ার হোসেন বলেন, আমার মেয়ে প্রতিদিনের ন্যায় সোমবার বিকেলে প্রাইভেট পড়ার জন্য বাসা থেকে বের হয়ে যায়। সে বাসা হতে প্রাইভেটের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যাওয়ার সময় ৪-৫ জন অজ্ঞাত ছেলে বাসার আশপাশে মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরাঘুরি করে। পরে পুলিশের মাধ্যমে জানতে পারি হোটেল নর্থভিউয়ের সামনে মেয়ের লাশ পড়ে আছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে মেয়ের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটির মেসেজসহ বিভিন্ন তথ্য ডিলেট অবস্থায় দেখতে পাই।

যা বলছেন ডিবি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা

ঘটনার দিন বিকেলে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরপিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী সাংবাদিকদের বলেন, মেয়েটির কল লিস্ট বিশ্লেষণ করে জানতে পারি যে সাকিনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। এছাড়া তাদের বন্ধুরাও একই কথা বলেছে। আমাদের কাছে আরও তথ্য রয়েছে, যেগুলো ভেরিফাই করা হচ্ছে। তাদের প্রেমের সম্পর্ক প্রায় ৯-১০ মাসের। তাদের মাঝে কথা হতো, দেখা হতো— এমন তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে এবং সাকিন সেটি স্বীকারও করেছে। তাদের ফোনের ডিটেইল চেক করে দেখা গেছে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সাকিনের সঙ্গে কথা বলেছে নুজশাত। তবে ঘটনার সময় সাকিন সেখানে উপস্থিত ছিল না। আমরা সাকিনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বিজ্ঞ আদালতে পাঠিয়েছি। এ ঘটনায় আরও তদন্ত চলছে।