ব্যক্তিগত আক্রোশে কুড়িগ্রামের রৌমারীতে দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার উপজেলা প্রতিনিধি রফিকুল ইসলাম সাজুর বাড়িতে মাদক উদ্ধারের অভিযান চালিয়েছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাফিউর রহমান। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার দিকে দুজন পুলিশ সদস্য ও কয়েকজন আনসার সদস্য নিয়ে তিনি উপজেলার সবুজপাড়ায় সাংবাদিক সাজুর বাড়িতে নিষ্ফল অভিযান পরিচালনা করেন। এ সময় সাংবাদিক সাজু বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন।
অভিযানের বিষয়টি স্বীকার করে এসিল্যান্ড রাফিউর রহমান বলেন, ‘আমার কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছিল যে, সাংবাদিক সাজু মাদকাসক্ত এবং তার বাড়িতে মাদক আছে। এজন্য রৌমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে (ইউএনও) অবগত করে অভিযান চালিয়েছি। তবে সাংবাদিকের বাড়িতে কোনও মাদক পাওয়া যায়নি।’
রৌমারী ইউএনও মাহবুবুল হাসান এসিল্যান্ডের এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইউএনও বলেন, ‘আমি ছুটিতে আছি। এসিল্যান্ডকে সার বিতরণের স্থলে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তিনি পথিমধ্যে সাংবাদিক সাজুর বাড়িতে অভিযান চালিয়েছেন। অভিযানের আগে তিনি আমাকে কিছু জানাননি। অভিযান শেষে জানতে পেরেছি।’
সাংবাদিক সাজুর ভাষ্য, ‘বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) আমি ফোনে এসিল্যান্ডকে অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম। একজন নাগরিকের জমির নামজারি করার ৭২ ঘণ্টার মধ্য বিনা নোটিশে তা বাতিল সংক্রান্ত প্রশ্ন করায় ক্ষেপে যান এসিল্যান্ড। সেই জেরে ফাঁসানোর জন্য আমার বাড়িতে বেআইনিভাবে অভিযান চালিয়েছেন। আমার বাড়ির জিনিসপত্র তছনছ করেছেন। তবে তার উদ্দেশ্য বিফলে গেছে। কিছুই পাননি।’
এসিল্যান্ড রাফিউর রহমানের বদলির আদেশ হয়েছে কয়েকদিন আগে। তাকে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে। এসিল্যান্ড রাফিউর রহমানের বিরুদ্ধে ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা প্রদান এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করে জানান, গত ২৭ আগস্ট এসিল্যান্ড রাফিউর রহমান উপজেলার দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের আমবাড়ি গ্রামের একটি জমির নামজারি করেন। ৩০ আগস্ট সেই নামজারি কোনও প্রকার নোটিশ এবং শুনানি ছাড়াই বাতিল করেন। সেটি তিনি করতে পারেন কিনা বুধবার সন্ধ্যায় মোবাইল ফোনে তাকে এ নিয়ে প্রশ্ন করি। এতে তিনি ক্ষেপে যান। আমাকে উল্টো প্রশ্ন করেন, “আমি কী করতে পারি আর না পারি সে জবাব আপনাকে দেবো?” সেই প্রশ্নের জের এবং ক্ষোভ থেকে আজ মাদক মজুতের ধোঁয়া তুলে পুরো বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছেন। কিন্তু তিনি মাদকের কোনও অস্তিত্ব পাননি। নিষ্ফল হয়ে ফিরে গেছেন। যাওয়ার আগে আমার বাড়ির জিনিসপত্র তছনছ করে রেখে গেছেন।’
‘অভিযান ছিল একটা নাটক। এই এসিল্যান্ড ভয়াবহ রকমের প্রতিশোধ পরায়ণ। তিনি সাংবাদিক ও সাংবাদিকের প্রশ্ন সহ্য করতে পারেন না। রৌমারীতে তিনি অবাধে অনিয়ম-দুর্নীতি করে গেছেন। এরা অফিসার হয়ে নিজেদের জনগণের প্রভু ভাবতে শুরু করে। এমন ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত’ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন সাংবাদিক সাজু।
রৌমারী রিপোর্টার্স ক্লাবের সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘এই এসিল্যান্ড ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। শুধুমাত্র প্রতিশোধ পরায়ণতা থেকে সাংবাদিক সাজুর বাড়িতে বেআইনিভাবে অভিযান চালিয়েছেন এসিল্যান্ড। তার বিরুদ্ধে অফিসের চেইনম্যানকে কানুনগো বানিয়ে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। তার অফিসে ঘুষ বাণিজ্য ও দালাল সংক্রান্ত প্রশ্ন করায় তিনি কয়েকজন সাংবাদিককে তার অফিস থেকে বের করে দিয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রতি দাবি জানাচ্ছি।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে এসিল্যান্ড রাফিউর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। পুুলিশের একজন এসআইকে প্রসিকিউশনের দায়িত্ব দিয়ে অভিযান করা হয়। তবে কিছু পাওয়া যায়নি।’
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত না করে কারও বাড়িতে এভাবে অভিযান পরিচালনা করা যায় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে এসিল্যান্ড বলেন, ‘ইউএনও স্যারকে জানিয়ে গিয়েছি।’ ইউএনও বলছেন তিনি অবগত ছিলেন না এমন প্রশ্নে এসিল্যান্ড বলেন, ‘বিষয়টি সত্য নয়। আমি বলে গিয়েছি। উনি জানেন।’
সাংবাদিকের বাড়িতে মাদক উদ্ধার অভিযানে স্থানীয় কাউকে সঙ্গে নিয়েছিলেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে এসিল্যান্ড বলেন, ‘আপনি কি আমাকে সবক দিচ্ছেন? সাক্ষী কী সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হবে? ওখানে এমনিতেই অনেক উৎসুক জনতা ছিল।’
বিষয়টি নিয়ে ইউএনও মাহবুবুল হাসানের সঙ্গে ফের যোগাযোগ করলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তাকে সারের বিষয় দেখার জন্য পাঠানো হয়েছিল। সাংবাদিকের বাড়িতে অভিযানের বিষয়ে আমাকে বলেনি কিছু। আমি পরে বিষয়টি জেনেছি। এ নিয়ে সাংবাদিক সাজুর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। জমির নামজারি সংক্রান্ত বিষয়ে কোনও প্রক্রিয়গত ত্রুটি হলে আমি ফের শুনানি করবো।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।