পণ্য পরিবহনে ওজনসীমা কমানোর প্রতিবাদ, আধুনিকায়ন এবং অন্যান্য স্থলবন্দরের মতো সমান বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধার দাবি মেনে নেওয়ায় ভারতীয় ব্যবসায়ীরা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছেন। ফলে টানা পাঁচদিন বন্ধ থাকার পর দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে আবারও দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য শুরু হয়েছে। বন্দর দিয়ে বাণিজ্য কার্যক্রম পুনরায় চালু হওয়ায় কর্মচাঞ্চল্য ফিরতে শুরু করেছে, একইসঙ্গে স্বস্তি ফিরেছে শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যেও।
শনিবার সকাল ১১টায় বাংলাদেশ থেকে বিস্কুটবোঝাই একটি ট্রাক ভারতে প্রবেশের মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য কার্যক্রম শুরু হয়। পরে দুপুর ১২টার দিকে ভারত থেকে আমদানিকৃত পণ্যবাহী ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এর মধ্য দিয়ে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে দুই দেশের মধ্যে পুরোদমে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট সুমন বলেন, ‘ভারতীয় ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের কারণে টানা ৫দিন ধরে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি বন্ধ ছিল। এ সময়ে ভারত থেকে কোনও পণ্য আমদানি হয়নি, তেমনি বাংলাদেশ থেকেও কোনও পণ্য ভারতে রফতানি হয়নি। ফলে ভারতে অনেক আমদানিকৃত পণ্যবাহী ট্রাক আটকা পড়েছিল। একইভাবে বাংলাদেশ থেকে রফতানির উদ্দেশে আসা অনেক পণ্যবাহী ট্রাকও বন্দরের ভেতরে আটকা ছিল। ধর্মঘট প্রত্যাহার হওয়ায় শনিবার থেকে আবারও দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম চালু হয়েছে। এতে আটকে থাকা ট্রাকগুলো ভারতে যেতে পারছে। কাজকর্ম শুরু হওয়ায় সি অ্যান্ড এফ এজেন্টদের পাশাপাশি শ্রমিকরাও খুশি হয়েছেন।
ট্রাকচালক মমিন হোসেন বলেন, ভারতে ধর্মঘট চলার কারণে আমরা ৫দিন ধরে হিলি স্থলবন্দরে রফতানিকৃত পণ্যবাহী ট্রাক নিয়ে আটকা ছিলাম। তারা ধর্মঘট প্রত্যাহার করায় আজ থেকে আমদানি-রফতানি শুরু হয়েছে। এতে আমরা আটকা অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়েছি। এখন রফতানিকৃত বিস্কুটবোঝাই ট্রাক নিয়ে ভারতে প্রবেশ করতে পারছি। খুব ভালো লাগছে।
হিলি স্থলবন্দরে কর্মরত শ্রমিক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘ভারতে ধর্মঘটের কারণে গত ৫দিন ধরে বন্দরে কোনও ভারতীয় ট্রাক প্রবেশ করেনি। এর ফলে আমাদের কাজকর্ম তেমন একটা ছিল না। প্রতিদিন এসে কাজ না করেই খালি হাতে বাড়ি ফিরে যেতে হয়েছে। আয়-রোজগার না থাকায় আমাদের খুব কষ্ট করে দিন কাটাতে হচ্ছিল। আজ আবারও বন্দর দিয়ে ভারত থেকে পণ্যবাহী ট্রাক প্রবেশ করতে শুরু করেছে। এতে আমাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম শুরু হয়েছে। আয়-রোজগার বাড়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে ভালোভাবে চলতে পারব।
হিলি কাস্টমস সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফেরদৌস রহমান বলেন, ‘ভারতীয় ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের ফলে টানা ৫ দিন ধরে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রফতানি বন্ধ ছিল। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রশাসনের সঙ্গে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকটি ফলপ্রসূ হওয়ায় এবং তাদের দাবিগুলো মেনে নেওয়ায় ভারতীয় ব্যবসায়ীরা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেন। শনিবার থেকে পুনরায় দুই দেশের মধ্যে যথারীতি আমদানি-রফতানি চালু হবে বলে গতকাল এক চিঠির মাধ্যমে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা আমাদের জানিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, ‘শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির কারণে আমদানি-রফতানি বন্ধ ছিল। শনিবার সকালে বাংলাদেশ থেকে ভারতে পণ্য রফতানি এবং ভারত থেকে পণ্য আমদানির মধ্য দিয়ে পুনরায় দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এরইমধ্যে ধর্মঘটের কারণে ভারতে আটকা পড়া পণ্যবাহী ট্রাকগুলো বাংলাদেশে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। এতে ব্যবসায়ীরা যে ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন, তা কিছুটা নিরসন হবে। একইসঙ্গে সরকারের রাজস্ব আহরণও স্বাভাবিক হয়ে আসবে। এ ছাড়া আমদানি-রফতানি বন্ধ থাকায় বন্দরে কর্মরত শ্রমিকরা যে মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন, তারাও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশে ফিরবেন।
প্রসঙ্গত, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকার ট্রাকে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ওজনসীমা নির্ধারণ করে গত রবিবার থেকে তা কার্যকর করে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৬ চাকার ট্রাকে ৩০ টনের পরিবর্তে ২০ টন এবং ১০ চাকার ট্রাকে ৪০ থেকে ৪৫ টনের পরিবর্তে সর্বোচ্চ ৩০ টন পণ্য পরিবহনের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। ট্রাকে পণ্য পরিবহনে নির্দিষ্ট ওজনসীমা নির্ধারণের প্রতিবাদে এবং অন্যান্য স্থলবন্দরের মতো হিলি স্থলবন্দরেও একই ধরনের সুযোগ-সুবিধার দাবিতে গত রবিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু করেছিলেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। ফলে গত রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত টানা ৫দিন দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে বন্ধ ছিল।
এদিকে, আমদানি-রফতানি বন্ধ থাকায় গত ৫দিনে প্রায় ৫ কোটি টাকা রাজস্ব থেকে সরকার বঞ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছে কাস্টমস।