রংপুর নগরীর হিন্দু অধ্যুষিত মাসুয়াপাড়া মহল্লায় রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, মেয়ে ও একমাত্র ছেলেসহ চার জনকে হত্যার ঘটনার প্রায় দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও আতঙ্ক কাটেনি মহল্লাবাসীর। স্বজন ও স্থানীয়দের প্রশ্ন—নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কি ধামাচাপা পড়ে গেলো? এরই মধ্যে দরজায় কড়া নাড়ছে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের পর এবার উৎসবের আনন্দেও ভাটা পড়েছে বলে জানিয়েছেন পাড়ার লোকজন।
সরেজমিন মঙ্গলবার মাসুয়াপাড়া মহল্লায় গিয়ে দেখা যায়, নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে পুলিশ পাহারা রয়েছে। নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের পর ওই এলাকার একমাত্র মন্দিরে শারদীয় দুর্গাপূজার তেমন কোনও আমেজ নেই। মূর্তি তৈরি ও অন্যান্য প্রস্তুতি চললেও নেই আগের মতো সাজসজ্জা বা কর্মব্যস্ততা। পুরো মহল্লায় এক ধরনের সুনসান নীরবতা। এমনকি ছোট শিশুদের মধ্যেও নেই উৎসবের উচ্ছ্বাস। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ নিয়ে কথা বলতে চাইলেও কেউ কিছু বলতে রাজি হননি।
মন্দিরে গিয়ে দেখা যায়, সাদামাটাভাবে মূর্তি তৈরির কাজ শেষ হয়েছে। মন্দিরের সহকারী পুরোহিত অভিলাষ বর্মন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোনও রকমে হলেও উৎসব করতে হবে, তাই প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে এবার তেমন কোনও সাজসজ্জা হবে না। এখানের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাটেনি এখনও। পূজা উদযাপন করতে হয়, তাই করা হচ্ছে।’
শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রবেশপথের গেটের ভেতরে পুলিশ পাহারা দিচ্ছে। কর্তব্যরত এক পুলিশ সদস্য জানান, তারা বাড়িটি পাহারা দিচ্ছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ছাড়া কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। এর বাইরে তিনি কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির সামনে কথা হয় তুলশী দাস নামে এক গৃহবধূর সঙ্গে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা দেড় মাস ধরে চরম আতঙ্কের মধ্যে কাটাচ্ছি। আমাদের আবার পূজার আনন্দ। দিনের বেলা ভয় না লাগলেও সন্ধ্যার পর জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাসার বাইরে বের হই না। এবার পূজার আনন্দ ফিকে হয়ে গেছে। একটি পরিবারের চার জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো, এরপরও আমরা কীভাবে ভালো থাকি?’
তিনি আরও বলেন, ‘ছেলেমেয়েদের জন্য এবার এখনও জামাকাপড় কেনা হয়নি। মনে শান্তি নেই। তারপরও পূজা উদযাপন করবো আমরা। তবে ওই পরিবারকে আমরা ভীষণ মিস করবো।’
একই কথা বললেন স্থানীয় বাসিন্দা আশিষ দাস। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাসুয়াপাড়ায় আমার জন্ম। দীর্ঘ ৩০ বছরেও এমন আতঙ্ক দেখিনি। ওই ঘটনার পর থেকে আমরা সার্বক্ষণিক ভয়ে থাকি। আমাদের ওপরও দুর্বৃত্তরা হামলা করতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, কারা এর নেপথ্যে—এটা এখনও আমরা নিশ্চিত হতে পারলাম না। দেড় মাস অতিবাহিত হয়ে গেলো। কয়েক দিন পুলিশ, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন মানুষের দৌড়ঝাঁপ দেখলাম। এখন কেন জানি সবাই চুপচাপ। এই রহস্য বুঝলাম না। তবে আমরা প্রকৃত হত্যার রহস্য উদঘাটন চাই। খুনি ও তাদের সহযোগীরা আইনের আওতায় আসুক।’
মনু বালা দাস নামে এক বৃদ্ধা বলেন, ‘আবারও একই ঘটনা ঘটবে কিনা, সেই আতঙ্কে আছি আমরা মহল্লাবাসী। ভয়ে ঘর থেকে বের হই না। কখন কী হয়, ভগবান জানেন। এবার আমরা আনন্দ-উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা পালন করতে পারবো না। তারপরও বছরে একটি উৎসব, যতটুকু করা দরকার, করার চেষ্টা করছি।’
গৃহবধূ বিনু দাসও একই ধরনের উদ্বেগের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা চরম আতঙ্কের মধ্যে আছি। প্রশাসন আমাদের পূর্ণ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারছে বলে মনে করি না। একটি পরিবারের চার জনকে হত্যা করা হলো। এত বড় ঘটনার পরও এখনও হত্যাকাণ্ডের পুরো জট খুলছে না কেন?’
পুলিশ অনেক আলামত পরীক্ষার জন্য নিয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘এত সময় লাগছে কেন প্রতিবেদন দিতে? আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমরা আর আশ্বস্ত হতে পারছি না। পূর্ণ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাই। এ বছর আর আনন্দে মাততে পারবো না। আতঙ্ক নিয়েই এবার পূজায় বসবে মাসুয়াপাড়াবাসী।’
এদিকে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেফতার মুগ্ধ দাসের বাড়িতেও নেই উৎসবের আয়োজন। তার বাবা বিনয় দাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছেলে কারাগারে থাকায় আমাদের বাড়িতে এবার উৎসবের কোনও আয়োজন নেই। বাড়িতে চলছে কান্নার রোল। এর মধ্যে পূজা করতে হবে আমাদের।’
পাড়ার বাসিন্দারা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ও ভয় কাটিয়ে নির্বিঘ্নে দুর্গাপূজা উদযাপনের জন্য প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
গত রবিবার রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দুর্গাপূজা উপলক্ষে বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় মাসুয়াপাড়া মহল্লায় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশাসনের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক ইসরাত জানান, সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
গত ২১ আগস্ট নগরীর মাসুয়াপাড়া মহল্লায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রতীলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও স্কুলছাত্র একমাত্র ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীসহ চার জনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনার পরদিন পুলিশ মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামে দুজনকে গ্রেফতার করে। আসামিরা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
এরপর মামলাটির তদন্ত করছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। দুই আসামির ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা ঢাকায় নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৩৫ ধরনের আলামত সিআইডি দফতরে পাঠানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত এসব পরীক্ষার কোনও প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।
পুলিশের দাবি, দুই আসামি চার জনকে একে একে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে। তবে নিহতদের স্বজনসহ স্থানীয় অনেকেই পুলিশের এ বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। ফলে মামলার তদন্ত ও হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য নিয়ে জনমনে এখনও নানা সন্দেহ রয়েছে, যার মূল রহস্য এখনও জানা যায়নি।