চারদিকে উৎসবের সাজ: দুয়ারে পা ফেলবেন দেবী দুর্গা, চলছে গ্রহণের প্রস্তুতি

সারা বছরের অপেক্ষা, চারদিকে সাজ সাজ রব। অবশেষে দুয়ারে পা ফেলবেন দেবী, মাঝে আর কয়েকদিন বাকি। ১৬ অক্টোবর থেকে শুরু হবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। তা ঘিরে নীলফামারীতে ৮৪৯ মণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করে শিল্পীরা এখন রংতুলির শেষ আঁচড় লাগাতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। দম ফেলার ফুরসত নেই তাদের। তোরণ নির্মাণ ও মণ্ডপ নানা রঙে সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে পূজা উদযাপন কমিটি।

এদিকে পূজা চলাকালে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে। ইতিমধ্যে পূজামণ্ডপগুলোতে বাড়ানো হয়েছে পুলিশের নজরদারি।

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের নেতারা জানিয়েছেন, এবার জেলায় ৮৪৯টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে সদরে ২৮৪টি, ডিমলায় ৭৬টি, ডোমারে ১০৫টি, জলঢাকায় ১৮২টি, কিশোরগঞ্জে ১২২টি ও সৈয়দপুরে ৮০টি মণ্ডপ রয়েছে।

বড়বাজার পূজামণ্ডপের পুরোহিত মহেশ গাঙ্গুলী জানান, এবার ঘোড়ায় চড়ে কৈলাস থেকে দেবী দুর্গা আসছেন পৃথিবীতে, আর চলে যাবেন নৌকায় চড়ে। এখন পূজা ঘিরে মণ্ডপে সাজসাজ রব। ১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীর আগমনী বার্তা জানিয়ে দেওয়া হবে সবাইকে।

নীলফামারীতে ৮৪৯ মণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি

তিনি বলেন, এখন মণ্ডপগুলো আলোকসজ্জায় সাজানো হচ্ছে। দুর্গাদেবীকে সাজিয়ে তুলতে মৃতশিল্পীরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। খড়কুটো ও কাদামাটির কাজ প্রায় শেষ, চলছে শুধু রংতুলির শেষ আঁচড়।

সদরের কালিবাড়ী মন্দির, কালিতলা মন্দির, শ্রী শ্রী শিব মন্দির, মিলন পল্লী মন্দির, ডালপট্টি মন্দির, হাড়োয়া বড় বাজার মন্দির, দেবির ডাঙ্গা মন্দির ও বাহালী পাড়া কাছারি বাজার মন্দিরে গিয়ে দেখা যায় কারিগরদের ব্যস্ততা। রংতুলির শেষ আঁচড় দিতে ব্যস্ত কারিগররা। দেবীর প্রতিমা তৈরি ভাদ্র মাস থেকে শুরু হলেও কাজ শুরু হয় জৈষ্ঠ মাস থেকেই। রংতুলির পাশাপাশি এখন শুধু পোশাক ও অলঙ্কার পরানোর কাজ চলছে।  

শহরের হাড়োয়া মন্দিরের কারিগর বিষ্ণ রায় বলেন, ‘এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় প্রতিমা তৈরিতে কোনও সমস্যা হয়নি। তাই রংতুলির কাজও দ্রুত হয়ে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে কাদামাটি দিয়ে দেবীকে সাজানোর মধ্যে দিয়ে শুরু হয় প্রতিমা তৈরির কাজ। এখন এটাই আমার পেশা।’

দেবির ডাঙ্গা মন্দিরে দিনাজপুর থেকে প্রতিমা তৈরি করতে আসেন উমাপদ রায়। তিনি বলেন, ‘প্রায় ৩৫ বছর ধরে এই কাজ করি। প্রতিমা তৈরি করা ভীষণ ধৈর্য ও মনোযোগের কাজ। যদি একবার ভুল হয়ে যায়, তাহলে আবার নতুন করে সেটা তৈরি করতে হয়। মায়ের কাজ মন দিয়ে করতে হয়। সঠিকভাবে করতে গেলে একেকটি মণ্ডপের প্রতিমা বানাতে প্রায় তিন থেকে চার মাস লেগে যায়।’

উমাপদের সঙ্গে কাজ করেন আরও তিন কারিগর রতন, সুধির  ও অমল। তারা জানান, চুক্তি অনুযায়ী তারা মজুরি পান। উপকরণ ও মালামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় কাজ শেষে হাতে কিছুই থাকে না। এখন এই পেশায় জীবন-জীবিকা চলে না। অনেকেই অন্য পেশায় চলে গেছেন। বাপ দাদার পেশা ধরে রাখতে কাজটি করছেন তারা।

বাহালিপাড়া কাছারি বাজার মণ্ডপের প্রতিমাশিল্পী প্রদীপ রায় বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই পেশা হিসেবে এ কাজই করে থাকি। এখন আগের থেকে কাজের ধরন বদলে গেছে। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করতে না পারলে নানা কথা শুনতে হয় পূজা কমিটির লোকদের। এভাবেই হাজারও সমস্যার মধ্যে দিয়ে জীবন পার করছি। তবে পূজা শেষে আমাদের খবর কেউ রাখে না। দিন শেষে কেউ কেউ প্রশংসাও করেন।’

প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করে শিল্পীরা এখন রংতুলির শেষ আঁচড় লাগাতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন

ওই মণ্ডপের সভাপতি ধীরেশ চন্দ্র রায় বলেন, ‘এবার মায়ের সন্তুষ্টির জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। তবে উপকরণ এবং কারিগরদের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় এবার প্রতিমা তৈরি ও পূজামণ্ডপের সামগ্রিক খরচ অনেকটাই বেড়ে গেছে। এজন্য হিমশিম খেতে হচ্ছে। অন্য খরচ বাদে শুধু কারিগদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা। যা আগে এক লাখে করেয়েছি। তবু সবমিলিয়ে আশা করছি, পূজা সুন্দরভাবে শেষ হোক।’

নীলফামারীর শ্রী শ্রী শিব মন্দিরের সভাপতি তিমির কুমার বর্মণ (তপন) বলেন, ‘শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে মণ্ডপগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলা পুলিশের কার্যালয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আশা করছি, কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই পূজা সুন্দরভাবে শেষ হবে।’

নীলফামারীর পুলিশ সুপার মো. ফরহাদ হোসেন খাঁন বলেন, ‘দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যাতে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে না পারে, সে ব্যাপারে জেলা পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। একই সঙ্গে গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো প্রতিরোধে ফেসবুকে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আশা করছি, কোনও ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই পূজা সুন্দরভাবে শেষ হবে।’