প্রশাসন ও থানা সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ নভেম্বর শাবিতে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা শুরু হয়। ভর্তি পরীক্ষা শুরুর আগেই পরীক্ষায় জালিয়াতি করার উদ্দেশে শাবিতে নিয়ে আসা অত্যাধুনিক কিছু ডিভাইস আটক করা হয়। ডিভাইস সরবরাহ চক্রের দু’জন ছাড়াও ভর্তিচ্ছু পাঁচ শিক্ষার্থী ও শাবি ছাত্রলীগকর্মী আল-আমিনকে আটক করে পুলিশ।
এর আগেই ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির ঘটনায় শাবি প্রশাসনের নীরব ভূমিকা ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অশোভন আচরণের প্রতিবাদে ও জালিয়াত চক্রের মূলহোতাদের ধরার দাবিতে ৫ ডিসেম্বর সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। এ ঘটনায় আটক আল আমিন হলেন শাবি ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি অঞ্জণ রায়ের গ্রুপের সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলামের অনুসারী ও সক্রিয় কর্মী।
তাকে আটক করা হলেও প্রশাসন থেকে কোনও মামলা করা হয়নি বলে জালালাবাদ থানার ওসি আক্তার হোসেন জানিয়েছিলেন। আন্দোলনকারীদের বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন একাধিক শিক্ষার্থী। ঘটনার ১৫ দিন পর ১১ ডিসেম্বর আল-আমিনকে সাময়িক বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
জালিয়াতি ঘটনার তদন্ত কমিটির সভাপতি আখতারুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের প্রথম কাজটা সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা নেওয়া। সেটা আমরা করেছি। জালিয়াতি প্রচেষ্টার তদন্তও চলছে।’ দ্রুতই তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে জানালেও ঘটনার ২৭ দিন পরও তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়া হয়নি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অভিযুক্ত শিক্ষার্থী আল-আমিন জেলে থাকায় এখনও তার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট দেওয়া যাবে।’
এর মধ্যে ২০ ডিসেম্বর শাবি ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনাও ভর্তি পরীক্ষার জালিয়াতির ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ ওঠে।
ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইমরান খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে আবু সাঈদ আকন্দ, অঞ্জন রায়, সাজিদুল ইসলাম সবুজ গুলি ছোঁড়ে। সম্প্রতি ভর্তি পরীক্ষায় যারা জালিয়াতির ঘটনায় গ্রেফতার হয়েছে, এরা তাদেরই অনুসারী। এদের বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসে জোরালো ভূমিকা রাখার কারণেই তারা আমাকে হত্যা করতে চেয়েছে।’
অন্যদিকে ২০ ডিসেম্বরের ঘটনাকে ক্ষোভের বিস্ফোরণ উল্লেখ করে সহ-সভাপতি আবু সাঈদ আকন্দ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সম্প্রতি ইমরানের কর্মীরা আমাদের কর্মীদের হুমকি দিয়েছিল। এমনকি সে বিশ্ববিদ্যালয়ে বলয় বাড়ানোর জন্য শিবিরের কর্মী, অছাত্র ও বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের ছাত্রলীগের কমিটিতে নিয়ে এসেছে। এজন্য তার ওপর শাবি ছাত্রলীগের কর্মীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ছিল।’ ভর্তি জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।
যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সাজিদুল ইসলাম সবুজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইমরানের কর্মীরা ঘটনার আগেরদিন রাত ৩টায় আমাদের এক কর্মীকে হলে মারধর করে এবং ঘটনার দিনে বিকালে ক্যাম্পাসে তাকে ধাওয়া দেয়।’ অপর এক প্রশ্নে সবুজ বলেন, ‘ভর্তি জালিয়াতি এবং ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া দুইটা ভিন্ন জিনিস। আমরাও এ জালিয়াতি চক্রের বিরুদ্ধে।’ এ বিষয়ে সহ-সভাপতি অঞ্জণ রায়কে ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী সারওয়ার তুষার, গিয়াস বাবু ও দিপাঙ্কর কপিল দে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা ডিসেম্বরের শুরু থেকে ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াত চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা ও মূল হোতাদের শনাক্ত করে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছি। কর্তৃপক্ষ তাতে কোনও কর্ণপাত করেনি। আমাদের দাবির কারণে শুধু ছাত্রলীগকর্মী আল আমিনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি এখনও তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করেনি।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘ওই চক্রের মূল হোতাদের নিরাপদ রাখতেই ক্যাম্পাসকে নানা ঘটনায় অস্থিতিশীল করে তোলা হচ্ছে। আর প্রশাসনও এ বিষয়ে নিশ্চুপ থাকছে।’
কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সংসদের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শাবি ছাত্রলীগের ঘটনা সম্পর্কে আমরা অবগত রয়েছি। আমাদের একটি প্রতিনিধি দল শাবিতে গেছে। তাদের রিপোর্টের পর আমরা ব্যবস্থা নেব।’
এ বিষয়ে যোগাযোগ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. ইশফাকুল হোসেন ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতি চক্রের বিষয়ে কোনও প্রকার মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির ওই চক্রের মূল হোতাদের ধরার জন্য এখনও আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। ওই চক্রের মূল হোতাদের ধরা না গেলেও এরই মধ্যে ১৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়েছে শাবির ভর্তি কার্যক্রম। ২০ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়ার সময় সন্দেহজনক মনে হওয়ায় ‘এ’ ইউনিটের মানবিক বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করা শিক্ষার্থী মো. হোসাইন রাব্বিকে আটক করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
/টিআর/এফএস/আপ-এসএনএইচ/