সময় মতো বাঁধ না হওয়ায় সুনামগঞ্জে ৭২ হাজার হেক্টর জমির ধান পানির নিচে

বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে ধানসুনামগঞ্জে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ২৫ হাওরের ৭২ হাজার হেক্টর জমির কাঁচা বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে আনুমানিক হাজার কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে ১১৮টি হাওরের বোরো ফসল। সময়মত বাঁধ নির্মাণ না হওয়ায় এবং প্রকল্প উন্নয়ন কমিটি (পিআইসি) কাজে অনিয়ম করায় এমনটি হয়েছে বলে দাবি করেছেন কৃষকরা। এদিকে, কৃষকরা বাঁধ রক্ষায় স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করলেও পানি আটকাতে পারছেন না। গত ২৮ মার্চ থেকে জেলায় মাঝারি বৃষ্টিপাত চলছে। এতে নদ-নদী, খাল, বিলের পানি বেড়ে চলেছে। ধান পাকার আগেই কাঁচা ধানের তোড় পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।

বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখা গেছে, চারদিকে শুধু পানি। চোখে পড়ে না গোছা গোছা ধানের শীষ। বাঁধের নির্মাণ কাজ শেষ না হওয়ায় তা ভেঙে ঢুকছে পানি। এরপর আবার অসময়ের বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে নদনদী ও খালবিলের পানি বেড়ে হাওর ভেসে যাচ্ছে। জেলার ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ, দিরাই, শাল্লা, বিশ্বম্ভরপুর, জগন্নাথপুর, তাহিরপুর ও সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ২৫টি হাওরের ফসল তলিয়ে গেছে।

শাল্লা ইউপির কৃষক কনক মিয়া বলেন, ‘পিআইসিরা টাকা লুটেপুটে খেয়ে নিজেদের পকেট ভারী করেছে। আর কৃষকরা ধুঁকে ধুঁকে মরছে। এ হিসাব ক’জন রাখে? এবার দুর্ভিক্ষ ছাড়া কিছুই চোখে দেখছি না।’

IMG_20170404_103736সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় ২ লাখ ১৫ হাজার ৮১৭ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হলেও ফলন হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৮২ হেক্টর জমিতে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ ভেঙে এবং বাঁধে মাটি না দেওয়ায় সেই বাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে চন্দ্রসোনার তাল, সাথারিয়া, পাথারিয়া, বরাম হাওর, কাইক্কার ধার হাওর, ডুবাইল হাওর, নলুয়ার হাওর, জোয়ালভাঙ্গা হাওর, পাগনার হাওর, করচার হাওরসহ ২৫টি হাওরের ৭২ হাজার হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে। পাহাড়ি ঢল ও বর্ষণ অব্যাহত থাকায় জেলার ১১৮ হাওরের বোরো ফসল ঝুঁকিতে রয়েছে। অনেক স্থানে পানি আটকাতে কৃষকরা স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করলেও পানি আটকাতে পারছেন না।

জানা গেছে, ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে পানি উন্নয়ন বোর্ড ৪৮টি হাওরের বোরো ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ মেরামত, সংস্কার ও নতুন বাঁধ নির্মাণে ৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছিল। গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর কাজ শুরুর কথা থাকলেও কাজ শুরু হয়েছিল এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে। ফলে এখনও বাঁধের কাজ শেষ হয়নি। কোনও কোনও বাঁধে এখনও মাটি ফেলা হয়নি। এসব কারণে হাওরের ফসল নষ্ট হয়েছে বলে জানান কৃষকরা। সময় মতো বাঁধে মাটি পড়লে ফসলহানি এড়ানো যেত বলে জানিয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ পরিচালক মো. জাহেদুল হক বলেন, কাঁচা ফসল তলিয়ে যাওয়ায় এবার কৃষকের ক্ষতির পরিমাণ বেশি হবে। অধিকাংশ স্থানেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি ঢুকে ফসল নষ্ট হচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ পরিচালক কৃষিবিদ মো. জাহেদুল হক বলেন, ‘এ পর্যন্ত ৭২ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে। এতে আনুমানিক হাজার কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে। ১ লাখ ২০ হাজার কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করছি। তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য বরাদ্দ চাওয়া হবে।’
Sunamgonj pic 02পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আফসর উদ্দিন বলেন, ‘সুনামগঞ্জে আগাম বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গত কয়েক দিন যাবৎ হাওর এলাকার বাঁধের ডিজাইন ফেল করে বাধের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া ভারতের চেরাপুঞ্জিতে মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বরাক বেসিনে পানির চাপ ক্রমশ বাড়ছে। গতবারের চেয়ে এবার অনেক আগে থেকেই বৃষ্টি শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ আকার ধারণ করেছে। জেলার সবকটি নদনদী ও হাওরে বিপদসীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।’

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হারুন অর রশীদ বলেন, যথা সময়ে বাঁধের কাজ শুরু হলে এ রকম অবস্থায় পড়তেন না কৃষকরা। গত কয়েক দিনে একের পর এক বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যাচ্ছে।  

এদিকে, লোকসংস্কৃতি গবেষক লেখক ইকবাল হোসেন কাগজী বলেন, হাওর এলাকার নদনদীগুলো দীর্ঘদিন ধরে খনন না করায় পানিধারণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। তাই সামান্য বৃষ্টিপাত হলেই পানি উপচে হাওরে প্রবেশ করছে। 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পূর্বাঞ্চল) একেএম মমতাজ উদ্দিন বলেন, হাওর এলাকার ফসল আগাম বন্যার হাত থেকে রক্ষা করতে হাওর উন্নয়ন ও আগাম বন্যা প্রতিরোধ ও নিষ্কাশন প্রকল্পের আওতায় চলতি বছর ৬৮ কিলোমিটার নদী খনন কাজ শুরু হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষক আগাম বন্যার হাত থেকে মুক্তি পাবেন।

/বিএল/