সিলেটে জঙ্গিবাদের উত্থান আশির দশকে!

আতিয়া মহলআশির দশক থেকে সিলেট মহানগরকেন্দ্রিক জঙ্গি তৎপরতা শুরু হয়। তা সত্ত্বেও জঙ্গি দমনে সিলেটে এখনও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ কোনও ইউনিট গড়ে তোলা হয়নি। ফলে জঙ্গিরা নগরের বিভিন্ন বাসায় আত্মগোপনে থেকে অন্য এলাকাগুলোতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে আসছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, আধ্যাত্মিক নগর হিসেবে জঙ্গিদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে সিলেট। এর আগে জঙ্গিরা সিলেটে গ্রেনেড হামলা করেছে। এমনকি দেশের আলোচিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির প্রধান শায়খ আবদুর রহমানকেও সিলেটের টিলাগড়স্থ শাপলাবাগ এলাকার ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ থেকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়াও, বিভিন্ন সময় এই শহর থেকে গ্রেফতার করা হয় বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের নেতাদের।
ওই সময়ে জঙ্গি তৎপরতার প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকেই নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে তৎপরতা চালানো জঙ্গিদের অনেকেই একসময় সিলেটে বসবাস করেছে। আশির দশকে সিলেট থেকেই আফগানিস্তানে যুদ্ধের জন্য সদস্য (মুজাহিদিন) সংগ্রহ করা হতো। এমনকি, ওই সময় নগরের মধুবন মার্কেটের সামনে প্রকাশ্যে সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই সময়ে আফগানিস্তানের তালেবান সদস্যরা স্লোগান দিত, ‘আমরা হবো তালেবান, বাংলা হবে আফগান।’মৌলভীবাজারে বড়হাট এলাকার জঙ্গি আস্তানা
সর্বশেষ ২৪ মার্চ শুক্রবার সিলেটের শিববাড়িতে আতিয়া মহলের সন্ধান পায় পুলিশ। পরে সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’-এ চার জঙ্গি নিহত হয়। সেখানে অভিযান চলাকাকালে গত ২৫ মার্চ নিরাপত্তা বাহিনীর বেষ্টনীর মধ্যে গ্রেনেড হামলা চালায় জঙ্গিরা। আর ২৬ মার্চ জঙ্গি আস্তানা ‘আতিয়া মহলে’র ২শ গজ সামনে আত্মঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে। দুটি বিস্ফোরণে র্যা বের গোয়েন্দা প্রধান লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ, দু’জন পুলিশ কর্মকর্তাসহ সাত জন নিহত হন। গ্রেনেড হামলায় আহত হন প্রায় ৬০ জন।
সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার গোলাম কিবরীয়া বলেন, ‘জঙ্গি নিয়ে বাংলাদেশে একমাত্র বিশেষায়িত সংস্থা হিসেবে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট কাজ করে। তবে সিলেটে আলাদা কোনও ইউনিট আমরা গঠন করতে পারব না।’
সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) জেদান আল মুসা জানান, পুলিশসহ গোয়েন্দাদের নজরদারিও রয়েছে মহানগরীর এলাকাগুলোতে।
নাসিরপুরে জঙ্গি আস্তানাসূত্রে জানা যায়, সুবিদবাজারের লন্ডনি রোডে জঙ্গি সংগঠন গোল বর্ধন হেকমতে জামাতুল মুজাহিদের ক্যাম্প ছিল। ওই বাসাটিকে ওই সময় আফগান হাউস বলা হতো। ফিলিস্তিনি ও আফগান যুদ্ধে সিলেট থেকে নানা ধরনের লোভ দেখিয়ে সদস্য সংগ্রহ করা হতো। এছাড়াও, ভারতীয় ৭টি রাজ্যের বিচ্ছিন্নবাদী সংগঠন তাবাদীরা, উলফা, পিএনবি, মনিপুড়ি, লিবারেশন ফোরামের তৎপরতা ছিল সিলেট নগরী, মৌলভীবাজার ও কমলগঞ্জে। দেশে সেসময় জঙ্গি তৎপরতার উর্বরতার অন্যতম স্থান ছিল সিলেট নগরী।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০০১ সালে বাংলাদেশে যখন জঙ্গিবাদের উত্থান হয়, তখন সিলেটের সিনেমা হল থেকে শুরু করে, মসজিদ, কমিউনিটি সেন্টার, জনসভাসহ এমন কোনও জায়গা নেই যেখানে জঙ্গি হামলা হয়নি। ২০০৪ সালের ৭ আগস্ট নগরীর গুলশান সেন্টারে গ্রেনেড হামলায় মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ইব্রাহিম আলী নিহত হন। আহত হন দলটির ১৮ নেতাকর্মী। সেদিন অল্পের জন্য রক্ষা পান সিলেট সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদরউদ্দিন আহমদ কামরান, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ।
২০০৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর নগরের তাঁতিপাড়ার সৈয়দা জেবুন্নেছা হকের বাসায় (২২ নম্বর) জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভায়, ২০০৫ সালের ২ ডিসেম্বর নগরের টিলাগড়ে মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক সিটি মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের ওপর, ২০০৪ সালের ২১ মে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার প্রাঙ্গণে তৎকালীন ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর এবং ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বৈদ্যের বাজারে ঈদ পরবর্তী এক জনসভায় গ্রেনেড হামলা করে জঙ্গিরা।
/এমএইচ/এসএনএইচ/টিআর/