সিলেট ও মৌলভীবাজারে ৩ হাজার ২৮শ’ হেক্টর জমি প্লাবিত

সিলেটের বন্যা পরিস্থিতি (ছবি-সিলেট প্রতিনিধি)

বন্যায় সিলেট ও মৌলভীবাজারে প্রায় ৩ হাজার ২৮শ’ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ার ও মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ডিজি মো.শাহজাহান। তবে এর পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে তারা জানিয়েছেন। এর মধ্যে সিলেটের ছয় উপজেলা ও মৌলভীবাজারের পাঁচ উপজেলার  প্রায় চার লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। দুই জেলার ৩৯২টি প্রাথমিক এবং ৪১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। সিলেট ও মৌলভীবাজার থেকে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর

সিলেটের বন্যা পরিস্থিতি (ছবি-সিলেট প্রতিনিধি)

সিলেট: সিলেটে টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে  গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, জকিগঞ্জ, ওসমানীনগর, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জের  বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। গ্রামগুলো প্লাবিত হওয়ার কারণে এসব উপজেলার প্রায় আড়াই শ’ স্কুল বন্ধ রয়েছে। স্কুলগুলোয় খোলা হয়েছে আশ্রয় কেন্দ্র। ছয়টি উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ দুর্ভোগে রয়েছে। এসব এলাকার যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম এখন নৌকা। প্লাবিত গ্রামগুলোতে জনপ্রতিনিধিদের পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। এছাড়া দুর্গতদের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য প্রতিটি উপজেলায়  মেডিক্যাল টিম কাজ করছে।

নিজ এলাকা পরিদর্শনে শিক্ষামন্ত্রী ( ছবি- সিলেট প্রতিনিধি)

এদিকে শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ ও মাহমুদুস সামাদ চৌধুরী এমপিসহ বেশ কয়েকজন এমপি প্লাবিত গ্রামগুলো পরির্দশন করে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেছেন। 

সিলেটের জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্লাবিত এলাকাগুলোয় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। সরকার ও জেলা প্রশাসনের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণ ত্রাণ সামগ্রী রয়েছে। আমাদের ত্রাণের কোনও সমস্যা নেই বললেই চলে। বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এ পর্যন্ত ১২৭ মেট্রিক টন চাল ও ২ লাখ ৭৭ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে। সিলেটে ৯টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৮৯টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়াও প্রতিটি উপজেলায় মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে।

সিলেটের পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম জানান, ভারতের বরাক থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেটের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ফেঞ্চুগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, বালাগঞ্জ, ওসমানীনগর, গোলাপগঞ্জ ও জকিগঞ্জ উপজেলায় বন্যা দেখা দিয়েছে।

বালাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রদীপ সিংহ বলেন, ‘এখানে ১টি আশ্রয় কেন্দ্র ছাড়াও উপজেলার ৭টি স্কুলে বন্যার্তদের জন্য আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বন্যার্তদের মাঝে জেলা প্রশাসনের ত্রাণ সামগ্রীসহ নগদ টাকা বিতরণ করা হচ্ছে।’

ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হুরে জান্নাত বলেন, ‘বন্যার্তদের সহযোগীতার করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের দেওয়া ত্রাণ সামগ্রী যথাযথভাবে বিতরণ করা হচ্ছে। আশা করছি কুশিয়ারা নদীর পানি কমে গেলে  মানুষের দুর্ভোগও কমে যাবে।’

গোলাপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহাম্মদ আলতাফ হোসেন জানান, গোলাপগঞ্জে এখন পর্যন্ত কোনও আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়নি। তবে আমরা প্রস্তুত রয়েছি। পাহাড়ের নিচে যারা বসবাস করছে তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বন্যা দুর্গত এলাকায় ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।

বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, ‘দুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত আছে। রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় অধিকাংশ গ্রামে ত্রাণ সামগ্রী নৌকায় করে বিতরণ করতে হচ্ছে।’

মৌলভীবাজারের বন্যা পরিস্থিতি (ছবি-সিলেট প্রতিনিধি)

মৌলভীবাজার: মৌলভীবাজারে নতুন করে বন্যার পানি বাড়েনি। কিন্তু কুশিয়ারা নদী এবং হাকালুকি, কাউয়াদীঘি ও হাইল হাওরের পানি না কমায় জেলার পাঁচটি উপজেলায় প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। বন্যাকবলিত এলাকার সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জেলার ১৪২টি প্রাথমিক ও ৪১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ আছে।

মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা, জুড়ী, কুলাউড়া, রাজনগর ও সদর উপজেলার ২৩টি ইউনিয়নে বন্যা দেখা দিলেও বিশেষত হাকালুকি ও কাউয়াদীঘি হাওর এলাকায় এর প্রকোপ বেশি। এখানকার মানুষ প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। কিছু পরিবার আশ্রয় কেন্দ্রে উঠেছে।

মৌলভীবাজারের বন্যা পরিস্থিতি ২ (ছবি-সিলেট প্রতিনিধি)

বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম আবদুল্লাহ আল মামুন  বলেন, ‘পানি খুব বাড়েনি। তবে বড় সমস্যা যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা। অনেক দিন ধরে রাস্তায় পানি। রাস্তায় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। বাস চলাচল বন্ধ।’

জুড়ীতে চারটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। কুলাউড়ার ৭০টি গ্রামের প্রায় ৭০ হাজার মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় আছে। কুলউড়ায় আটটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

কুলাউড়ার উপজেলার ভুকশিমইল ইউপির চেয়ারম্যান মো. আজিজুর রহমান বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের ৭০ শতাংশ বাড়িঘরে পানি উঠেছে।’

রাজনগর উপজেলায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ৩০ হাজার মানুষ। নৌকা ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়ার উপায় নেই। পানি উঠায় অনেকে মাচা বেঁধে কোনও রকমে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। এখানে দুটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

মৌলভীবাজার-রাজনগর-বালাগঞ্জ সড়কের দুই কিলোমিটার তলিয়ে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে বাস চলাচল। মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় ১৫-২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে।

মৌলভীবাজারের দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে ২ (ছবি- মৌলভীবাজার প্রতিনিধি)

মৌলভীবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুল আলিম বলেন, জেলায় মোট ১৪২টি প্রাথমিক স্কুল বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

অপরদিকে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, ‘হাওর পাড়ের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছে। স্কুলগুলো তলিয়ে যাওয়ায় জেলার ৪২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধ রয়েছে।’

মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত  জেলায় সর্বশেষ ২৯৪ মেট্রিক টন জিআর চাল ও নগদ ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও ৫৯ হাজার ২০০ ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে তিন ধাপে ৬৫০ মেট্রিক টন চাল, ৩০ লাখ ৮০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তিন মাসের জন্য ৫ হাজার ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে প্রতিমাসে ৩০ কেজি করে চাল এবং ৫০০ করে টাকা দেওয়া হচ্ছে। রবিবার (২ জুলাই) দুর্যোগ মন্ত্রণালয় থেকে আরও ২০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্ধ দিয়েছেন। সেগুলোও বিতরণ করা হবে।

মৌলভীবাজারের বন্যা পরিস্থিতি (ছবি- মৌলভীবাজার প্রতিনিধি)

অপরদিকে রবিবার কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ত্রাণ বিতরণ করে কেন্দ্রীয় ও জেলা আওয়ামী লীগের একটি টিম। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেনের নেতৃত্বে এ টিমে রয়েছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সস্পাদক এস এম জাকির হোসাইন, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান, হুইপ মো. শাহাব উদ্দিন, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আব্দুল শহীদ এমপি, সাধারণ সম্পাদক নেছার আহমদ, আব্দুল মতিন এমপি, মৌলভীবাজারের পৌর মেয়র ফজলুর রহমান, জেলা যুবলীগ সভাপতি নাহিদ আহমদ প্রমুখ।

এদিকে জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম রবিবার দিনব্যাপী কুলাউড়া ও জুড়ী উপজেলার কয়েকটি আশ্রয় কেন্দ্র পরিদর্শন করেন বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন। ত্রাণ সামগ্রীর মধ্যে ছিল ৪০০ প্যাকেট শুকনো খাবার, জিআর চাল, জিআর ক্যাশ। শুকনো খাবারের মধ্যে ছিল চিড়া, চিনি, টোস্ট বিস্কুট ও মুড়ি।

মৌলভীবাজারের দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে (ছবি- মৌলভীবাজার প্রতিনিধি)

/জেবি/

আরও পড়তে পারেন: আ. লীগের দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বে রঙ হারালো উল্টো রথযাত্রা উৎসব