তবে আশার কথা হলো, জেলায় যে সব বীজতলা পানির নিচে তলিয়ে গেছে সে সব জমিতে বাঁধ নির্মাণ করে পানি সেচের মাধ্যমে সারিয়ে কৃষকরা বীজতলা বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। বৃষ্টি আর না হওয়ায় আশায় বুক বেঁধে রয়েছেন তারা।
হবিগঞ্জ কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর জেলায় প্রায় এক লাখ ২০ হাজার ৭০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন দুই লাখ ৮০ হাজার কৃষক। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যমাত্রা বানিয়াচং উপজেলায়। এ উপজেলায় ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
গত মৌসুমে অকাল বন্যায় শতকরা ৯০ ভাগ জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা সর্বস্বান্ত হয়ে এবার নতুন করে বোরো চাষাবাদে কাজ করছে। এর মধ্যে অনেক কৃষকই মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বীজতলা তৈরি করেছিলেন। তবে সম্প্রতি তিন দিনের বৃষ্টিতে অধিকাংশ বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক কৃষকেরই মাথায় হাত উঠেছে।
বানিয়াচং উপজেলার সাঙ্গর গ্রামের কৃষক আব্দুল আলী বলেন, ‘গত গ্রীষ্ম ও বার্ষায় বন্যায় সব তলিয়ে যাওয়ার পরও নতুন আশা নিয়ে বীজতলা প্রস্তুত করেছিলাম। কিন্তু অগ্রহায়ণ মাসে অকাল বৃষ্টি সেই স্বপ্ন ধ্বংস করে দিলো। এখন আবার নতুন করে বীজতলা তৈরি করে চাষাবাদ করাটা আমাদের জন্য কষ্টকর হবে।
একই গ্রামের কৃষক ফরিদ মিয়া জানান, ‘আমার জীবনে অগ্রহায়ণ মাসে এভাবে বৃষ্টি হতে দেখিনি। বীজতলার পাশাপাশি আমন ধান ও রবি শস্যেরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আবহাওয়ার এই পরিবর্তনে কৃষকের ওপর বিপর্যয় নেমে এসেছে।’
বানিয়াচং উপজেলার মুরাদপুর গ্রামের কৃষক আকবর আলী বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে প্রায় সব বীজতলা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এখনও পানি জমে আছে। জমিতে বাঁধ নির্মাণ করে শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি শুকিয়ে বীজতলা রক্ষার চেষ্টা করছি। যতটুকু ক্ষতি হয়েছে আবারও সেই বীজতলা নতুন করে তৈরি করা হচ্ছে। হিমশিম খেতে হলেও এখনও নতুন ফসল দেখায় আশায় বুক বেঁধে আছি।’
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার পইল গ্রামের কৃষক মোস্তফা মিয়া জানান, ‘আগের বন্যায় সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর নতুন করে বীজতলা তৈরি করে বোরো চাষাবাদ করার চেষ্টা করছি। তবে অতিবৃষ্টি কিছুটা বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। সেই বীজতলা আবারও তৈরির কাজ করছি। তবে আর এ ধরনের বৃষ্টি না হওয়ায় কৃষকদের মনে স্বস্তি ফিরে আসছে।’
এ ব্যাপারে হবিগঞ্জের নাগুড়া ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এটিএম সাখাওয়াত হোসাইন বলেন, ‘আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত আবহাওয়া অনুযায়ী কিভাবে কৃষক দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের জমির ফসল ঘরে তুলতে পারেন এ বিষয়ে আমাদের বিশেষ গবেষণা চলছে। বিশেষ করে ঠাণ্ডা মৌসুমে যে মুহূর্তে ধানের শীষ বের হয় সেই সময়তে আবহাওয়ার কারণেই অনেক ধান নষ্ট হয়ে যায়। আমাদের গবেষণার মাধ্যমে সেই আবহাওয়ার উপযোগী ধান কৃষকের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা অব্যাহত আছে। আশা করি শিগগিরই আমরা কৃষককে এ সুখবর দিতে পারবো।’
তিনি জমি থেকে পানি দেরিতে নামা প্রসঙ্গে বলেন, ‘বর্ষার পানির সঙ্গে পলি জমে অনেক নদ-নদী ভরাট হয়ে গেছে। ফলে এবার দেরিতে জমির পানি নামছে। সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বড় বড় হাওরের নদ-নদীগুলোর গভীরতা বাড়ালে সহজেই ধান রোপনের আগেই বর্ষার পানি জমি থেকে নেমে যাবে।’
হবিগঞ্জ কৃষি অধিদফতরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জমি থেকে বীজতলা রক্ষার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জেলার ৪০ হাজার কৃষকের মধ্যে ইতোমধ্যে ৫ কেজি বীজ, ৩০ কেজি সার ও নগদ ১ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। আগামী বোরো চাষাবাদের লক্ষ্য নিয়ে এখন ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।’