বাঘবেড় গ্রামের আব্দুন নূর (২৮) বলেন, ‘আকাশে কালা মেঘ দেখলে চোখের পলকে হাওর খালি হইয়া যায়। অনেকে ভয়ে বাড়ি চলে যায়। কেউ কেউ বাড়ি ফেরার পথে বজ্রপাতে আক্রান্ত হন। হাওরের কোথায় কোনও গাছপালা নেই, নেই কোনও আশ্রয়কেন্দ্র, ঝড়বাতাস শুরু হলে যাওয়ার কোনও জায়গা নেই কৃষকদের।’
হাফিজ ও আব্দুন নূরের মতো সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে কৃষকরা বজ্রপাতের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। একদিকে জমির পাকা ধান কেটে গোলায় তোলার তাগিদ, অন্যদিকে বজ্রপাতের আতঙ্ক-দুই মিলিয়ে দিশেহারা হাওরের কৃষকরা। গত কয়েকদিন ধরে বৈরী আবহওয়া উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ধান কাটছেন শ্রমিক ও কৃষকরা। ফলে প্রতিনিয়ত ঘটছে প্রাণহানির ঘটনা। এখন পর্যন্ত বজ্রাঘাতে ৮ কৃষক ও ধান কাটার শ্রমিকের প্রাণ গেছে।
বাঘবেড় গ্রামের মোহাম্মদ হারিছ মিয়া বলেন, ‘ঠাডা আমরার লাইগা বড় বিপদ হইয়া দাঁড়াইছে। পরতি (প্রতি) বছর হাওরে ধান কাটতে গিয়া অনেক মানুষ ঠাডা পইরা মইরা যায়। এর লাইগা হাওরে ধান কাটাতে মানুষ যাইতে চায় না। আগে জমিনে চুম্বুকের পিলার আছিল। তখন মাইনসের (মানুষের) শইলে (শরীরে) ঠাডা পড়তো না। আর অখন পিলার চুরি কইরা নেওয়ায় মাইনসের শইলে ঠাডা পড়ে। হুরুতা-বুড়াতা (ছোট-বড়) হগলের উপরেই ঠাডা পড়ে।’
বজ্রাঘাতে এখন পর্যন্ত হাওরে যাদের মৃত্যু হয়েছে তাদের বেশিরভাগ মানুষ শ্রমজীবী। পেটের দায়ে হাওরে ধান কাটতে গিয়ে তারা মারা যান। বর্ষা ও বোরো মৌসুমে প্রতিবছর বজ্রাঘাতে প্রায় অর্ধশতাধিক লোক প্রাণ হারান। কেউ ধান কাটতে গিয়ে, আবার কেউ ধান শুকাতে গিয়ে আক্রান্ত হন। ভারী বৃষ্টিপাত থেকে আগাম বন্যার সতর্কতা দিয়েছে পাউবো। এজন্য তারা দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দিয়েছে কৃষকদের। ধান হারানোর ভয়ে বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে প্রায় প্রতিদিনই কৃষকরা ধান কাটতে গিয়ে বজ্রাঘাতে প্রাণ হারাচ্ছে।
সুনামগঞ্জে বজ্রপাতের ঘটনা বেশি ঘটলেও জেলা হাসপাতালে নেই কোনও বার্ন ইউনিট বা উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা। ফলে আহতদের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না। বজ্রাঘাতে গুরুতর আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার্ড করা হয় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেকে এ চিকিৎসা করাতে হিমশিম খাচ্ছে।
কৃষকদের স্বার্থ নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠনের নেতাকর্মীরা জানান, হাওর এলাকায় বজ্রপাত সম্পর্কে মানুষ অসচেতন। তারা জানেন না কখন হাওরে যেতে নেই বা বজ্রপাতে মানুষের করণীয় সম্পর্কে। বিশাল হাওর এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে লোকজন কোথাও যেতে পারে না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসময় তারা হাওরে অবস্থান করেন। হাওরাঞ্চলে বজ্রপাত রোধে সচেতনতার পাশাপাশি সরকারিভাবে বজ্রপাত রোধক বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া উচিত।
‘হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও’ আন্দোলনের সভাপতি বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বলেন, ‘হাওরে যেসব অসহায় কৃষকদের প্রাণহাণি ঘটে সেই পরিবারগুলোকে সরকার যেন আর্থিক সহযোগিতার পরিমাণ বাড়িয়ে দেন।
জেলা প্রশাসক সাবিরুল ইসলাম জানান, হাওরবাসীকে সচেতন করতে মাইকিংয়ের পাশাপাশি উপজেলা, গ্রাম ও মাঠ পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া হাওরে বজ্রপাত রোধে গাছ রোপন করা হয়েছে আর বিভিন্ন হাওরে বজ্রপাতরোধ ধাতব পদার্থ তৈরি করা হবে। যাতে বজ্রপাতে হাওরাঞ্চলে প্রাণহানির ঘটনা কমে আসে।’