এলাকাবাসীর অভিযোগ, স্থানীয় ইউপি সদস্য মনেছারের নেতৃত্বে এই বাঁধটি বালু দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি বাঁধটি মজবুত করে তৈরি করেনি। ফলে বাঁধটি এখন ভেঙে গেছে।
সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শনিবার রাত সাড়ে ১০টা থেকে অস্বাভাবিকভাবে বৌলাই নদীর পানি বাড়তে থাকে। ঘণ্টাখানেনের মধ্যে ফসল রক্ষা বাঁধ উপচে হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকায় পানি ঢুকতে শুরু করে এবং ক্রমশ তা বাড়তে থাকে। ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে সীমান্তের ওপারে ও সুনামগঞ্জে ভারী বর্ষণ হয়। এ কারণে মেঘালয় থেকে পাহাড়ি ঢল নেমে আসায় বৌলাই নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং উজান থেকে নেমে আসা পানি ভাটির দিকে প্রবল বেগে ধাবিত হতে থাকে। এতে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের ডিজাইন লেভেল অতিক্রম করে পানি প্রবেশ করে। বাঁধ এলাকায় থাকা লোকজন পানি ঠেকানোর চেষ্টা করলেও পানির প্রচণ্ড চাপে তারা তা করতে ব্যর্থ হন।
বেহেলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রতি রঞ্জন পুরকায়স্থ বলেন, ‘হাওরে পানি প্রবেশের খবর পেয়ে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে ছুটে যাই। গিয়ে দেখি নদীর পানি ফসল রক্ষা বাঁধ উপচে হাওরে প্রবেশ করছে। এত বেশি জায়গা দিয়ে পানি ডুকছে যে, তা কোনোভাবেই আটকানো সম্ভবন নয়।’
কৃষক রইছ মিয়া বলেন, ‘হাওরের নিচু এলাকার জমির ধান কাটা হয়ে গেছে, এখন উচু এলাকায় কিছু জমির ধান রয়েছে। তবে খলায় (ধান ক্ষেত) এখনও অনেক ধান ও খড় রয়েছে, যেগুলো অরক্ষিত হয়ে পড়েছে।’
বেহেলী ইউপি সদস্য খোকন মিয়া বলেন, ‘এখন মানুষ আর ধান কাটা নিয়ে ভাবছে না। হাওরে রাখা ধান কীভাবে রক্ষা করবে, তা নিয়ে ভাবছে। অনেক কৃষক হাওরের ধান শুকানো ও মাড়াইয়ের কাজসহ খড় শুকানোর কাজ করছে। বিগত কয়েকদিনের বৃষ্টির কারণে মানুষ ধান ও খড় কোনোটাই শুকাতে পারেনি।’
ব্যবসায়ী রানু পাল বলেন, ‘পুরো হাওর তলিয়ে যেতে ১০-১৫ দিন সময় লাগবে। হঠাৎ করে বাঁধ উপচে পানি ঢোকায় কৃষকরা অনেকটা বিপদে পড়েছে।’
হালির হাওরের পিআইসি কমিটির সভাপতি মনেছা জানান, ‘দুই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে বৌলাই নদীর পানি অস্বাভাবিক বেড়ে গিয়ে মানুষকে বিপদে ফেলেছে।’
বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অসীম চন্দ্র তালুকদার বলেন, ‘হাওরের ৩০ ভাগ জমির ধান এখনও কাটা বাকি। তবে নিচু এলাকায় কোনও ধান কাটা বাকি নেই।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল মন্নাফ বলেন, ‘হাওরের সব জমির ধান কাটা হয়ে গেছে। তাহিরপুর, ধর্মপাশা, শাল্লা, দিরাই, জগন্নাথপুর, জামাগলঞ্জ এসব এলাকার হাওরের শতভাগ জমির ধান কাটা হয়ে গেছে। তাহিরপুর ও জামালগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা তাকে জানিয়েছেন যে, হালির হাওর ও শনির হাওরের শতভাগ জমির ধান কাটা হয়ে গেছে। এখন কিছু জমি রয়েছে যেগুলো অবস্থান বেশ উচু এলাকায়। হাওরে পানি প্রবেশ করায় ধানের কোনও ক্ষতি হবে না। দেরিতে রোপন করায় ধান পাকতে দেরি হচ্ছে বলে সদর দোয়ারাবাজার বিশ্বম্ভরপুর এলাকায় কিছু ধান কাটা বাকি রয়েছে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, শনিবার পর্যন্ত হাওর এলাকায় মোট এক লাখ ৭২ হাজার হেক্টর জমির মধ্যে এক লাখ ৬১ হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। হাওর ছাড়া মোট ৫২ হাজার হেক্টর জমির মধ্যে কাটা হয়েছে ২৬ হাজার হেক্টর জমির ধান। চলতি বোরো মৌসুমে জামালগঞ্জ উপজেলায় ২৪ হাজার ৬৬০ হেক্টর ও তাহিরপুর উপজেলায় ১৮ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ করা হয়। হালির হাওর ও শনির হাওরের ২০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ করা হয়েছিল।
এদিকে, রবিবার (৫ মে) সকাল পৌনে ১০টার দিকে প্লাবিত এলাকা পরিদর্শনে আসেন জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রিয়াংকা পাল। এ সময় তিনি বলেন, ‘বাঁধ নির্মাণে কারও গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’