‘গেরামে (গ্রামে) কোরবানি অয় (হয়) কম। তাই ঈদের দিন সকালে গোশতের জন্য টাউনে যাইমু (যাবো)। মাইনসের (মানুষের) গরু খাটিয়া (কেটে) দিলে কিছু গোশত দেয়। এগুলো লইয়া (নিয়ে) বিকালে বাড়িত আইমু (আসবো)। রাইতে (রাতে) হগলে (সবাই) খাইমু।’
কথাগুলো বললেন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের দামপাড়া গ্রামের দিনমজুর দিলোয়ার হোসেন।
যখন দিলোয়ারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল এ প্রতিবেদকের, তখন পাশেই দাঁড়ানো ছিলেন আশরাফ আলী। তিনি বলেন, ‘দামপাড়া গ্রামের লন্ডনপ্রবাসী এক পরিবার প্রতিবছর গরু কোরবানি দেয়। তবে গ্রামের সবাই গোশত পায় না। তাই মাংসের জন্য আমরা সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে শহরে যাই। বিকালে মাংস নিয়ে বাড়ি আসি।’
শুধু দিলোয়ার বা আশরাফ নয়, গৌরারং ইউনিয়নের বেশিভাগ মানুষেরই এ অবস্থা। এ ইউনিয়নের বেশিরভাগ মানুষই নিম্ন আয়ের; যাদের পশু কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য নেই। আর ইউনিয়নটির হাতেগোনা যেক’টি পরিবার পশু কোরবানি দেয়, তাদের কোরবানি দেওয়া পশুর মাংস দিলোয়ার ও আশরাফের মতো নিম্ন আয়ের মানুষের ভাগ্যে জুটে না। সেজন্য কোরবানির মাংস পাওয়ার আশায় ঈদের দিনই দিলোয়ার-আশরাফরা ছুটেন শহরে। সেখানে কোরবানি দেওয়া পশু কেটেকুটে দিয়ে যেটুকু মাংস পান তা নিয়ে বাড়ি ফেরেন বিকালে।
দামপাড়া গ্রামের পাঁচ সন্তানের জননী আলতাবুন্নেচ্ছা বলেন, ‘আশপাশের কয়েক গেরাম ঘুরে সামান্য মাংস মিলে। এগুলো দিয়ে একবেলা পেট পুরে খাওয়া যায় না। তাই গ্রামের গরিব মানুষ শহরে যায় মাংস পাওয়ার আশায়।’
একই গ্রামের আব্দুল হান্নান বলেন, ‘গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ দিনমজুর। কৃষিকাজ বা বালু-পাথর উত্তোলন করে সংসার চালায়। ধনীরা কোরবানি দিলে তারা যৎসামান্য মাংস পায়, না দিলে পায় না।’
দামপাড়ার গৃহিণী রহিমা খাতুন বলেন, ‘আমার সাত ছেলেমেয়ে। ছেলেরা কেউ পড়ালেখা করেনি। সবাই নদীতে বালি লোড-আনলোডের কাজ করে। পরপর দুইবার বন্যায় আমার বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই এবার আমি ঈদের আগের দিন বাজার থেকে পোল্ট্রি মুরগির কিনে আনবো। ঈদের দিন রান্না করে সবাইকে নিয়ে সেটাই খাবো।’
একই কথা জানান গ্রামটির সুকেশ দাস। তিনি বলেন, ‘গ্রামে হিন্দু-মুসলমানরা সম্প্রীতির মধ্যেই বাস করেন। বেশিরভাগ লোকই দিনমজুর; কোরবানি দিতে পারে না। সামান্য মাংসের জন্য ঈদের দিন শহরে চলে যায়।’
গৌরারং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফুল মিয়া বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে ৫৬টি ছোট-বড় গ্রাম রয়েছে। এসব গ্রামে ২৯ হাজার ভোটার রয়েছেন। লোকসংখ্যা ৪৫ হাজার। ইউনিয়নের বেশিরভাগ মানুষ দিনমজুর। ঈদ উপলক্ষে ইউনিয়নের তিনহাজার ২১০ জনকে ১৫ কেজি করে বিশেষ ভিজিএফ চাল দেওয়া হয়েছে। ঈদের পরদিন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইসলামিক রিলিফ ফাউন্ডেশন ও আরেকটি সংস্থা ১১টি গরু জবাই করবে। এই মাংস ২৮১ জন দরিদ্রের মধ্যে বিতরণ করা হবে।’