‘গেলোবার এমন সময় জালাধান বাইনের কাজ পুরোদমে করছি। ইবার অখনো জালাচারও কয়েক ফুট পানি রইছে। কোন দিন জালাচার ভাসবো আর কোন দিন জালাবাইন করমু।’ বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মুক্তিরখলা গ্রামের খরচার হাওরের প্রবীণ কৃষক আবদুল ওয়াহিদ (৬১) এভাবেই হাওরের জলাবদ্ধতার কথা জানালেন।
আবিদুর রহমান বলেন, ‘হাওরের পানি যাইবার কোনও পথ নাই। চারদিকে বান আর বান গাঙ্গ, হাওর দুইটাই পানিতে ভরপুর পানি নামবো কেমনে? বান কাইট্টা না দিলে অগ্রাহণ মাসও হাওরের পানি নামতো না। কোন দিন ক্ষেত ভাসবো আর কোন দিন জালাবাইন করমু। গেলোবার হাওরে পানি থাকার কারণে ক্ষেতগিরস্তি এক মাস পিছে লামছিলো, এবার দেড় মাস পিছে লামবো।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ট্রেনিং অফিসার মোস্তফা ইকবাল আজাদ বলেন, হাওরের পানি দেরিতে নিষ্কাশন হওয়ায় কৃষকরা কিছুটা হলেও সমস্যায় পড়েছেন। এখন দীর্ঘমেয়াদি জাতের চারা উৎপাদনের সময়। অতিবৃষ্টি ও চারবার বন্যার ফলে হাওরগুলো এখনও পানিতে তলিয়ে আছে। আরও কিছুদিন পর পরিস্থিতির উন্নতি হলে এ সংকট কেটে যাবে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করে বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
মল্লিকপুর গ্রামের আবুল কাসেম বলেন, ‘সরকার প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা খরচ কইরা হাওরে বান দেয়। কিন্তু স্থায়ীভাবে পানি আটকানো বা নিষ্কাশনের কোনও ব্যবস্থা করে না। ইতার লাগি প্রতি বছর বাড়ছে জলাবদ্ধতা।’
পিয়ারিনগর গ্রামের কৃষক বেনু দাস বলেন, ‘হাওরের আগাম বন্যা ঠেকানোর ও পানি নিষ্কাশনের জন্য টেকসই উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। তা না হলে বন্যা ও জলাবদ্ধতায় কৃষক প্রতিবছর ক্ষতির মুখে পড়বেন।’
বদরুল আলম বলেন, ‘হাওরে পানি থাকলে ক্ষেত লাগাইতে দেরি হয় আর ক্ষেত লাগাইতে দেরি হলে পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যার পানিতে কৃষক সর্বস্বান্ত হন। এজন্য স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।’
পদ্মনগর গ্রামের গোপেন্দ্র দাস বলেন, হাওরে জাঙ্গাল (ক্লোজার) গুলো এমনভাবে বাঁধা উচিত যেন ফসলের মৌসুমে হাওর থেকে পানি বের করে দেওয়া যায়। আবার আগাম বন্যার সময় ঢলের পানি ঠেকানো যায়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, নিবিড় বার্ষিক ফসল উৎপাদন কর্মসূচির আওতায় ২০২০-২১ অর্থবছরে জেলায় ১১ হাজার হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মোট ২ লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা যাবে।
মুক্তিখলা ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মিজানুর বলেন, এখন দীর্ঘমেয়াদি জাতের চারা উৎপাদনের সময়। হাওরের পানি দেরিতে নামায় কৃষক বীজতলা তৈরি করতে সমস্যায় পড়ছেন। তবে আরও কিছুদিন পরে স্বল্পমেয়াদি জাতের চারা উৎপাদন শুরু হবে। তখন পানি না কমলে সংকট আরও বাড়বে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সবিবুর রহমান বলেন, চেরাপুঞ্জিতে অতিবৃষ্টির ফলে সুনামগঞ্জে পরপর চারবার বন্যা হয়েছে। এমনকি গত মাসেও বৃষ্টি হওয়ায় হাওরের পানি কমেনি। এছাড়া হাওরের অভ্যন্তরের দুই শতাধিক খাল দিয়ে পানি নিষ্কাশন হচ্ছে। আগামী কিছু দিনের মধ্যে পানি আরও বেশি কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রয়োজন হলে বেড়ি বাঁধ কেটে দিয়ে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হবে।