সেচের পানির অভাবে সুনামগঞ্জে ৪৭ হাজার ৫৭২ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ করতে পারছেন না চাষিরা। এজন্য জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ এবং রাস্তাঘাট নির্মাণসহ স্থানীয় বিএডিসি সেচের খাল পুনঃখনন কর্মসূচিতে অনিয়মকেই দায়ী করছেন কৃষকরা।
সুনামগঞ্জ জেলায় চাষবাদ যোগ্য জমি রয়েছে ৩ লাখ ২৯ হাজার ২১৬ হেক্টর। এর মধ্যে চাষাবাদ হয় ২ লাখ ৭৬ হাজার ৪৩৪ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে আবার ৪৭ হাজার ৫৭২ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হচ্ছে না। মৌসুমি পতিত জমি রয়েছে ৩১ হাজার ১৩৮ হেক্টর ও সাময়িক পতিত জমি রয়েছে ১৬ হাজার ৪৩৪ হেক্টর। মৌসুমি পতিত জমি চাষাবাদের সুযোগ রয়েছে কিন্তু সেচ সুবিধার অভাবে এসব জমি পতিত থাকে। সাময়িক পতিত জমি কোনও বছর চাষাবাদ হয় আবার কোনও বছর চাষাবাদ হয় না। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হলে এসব জমিতে চাষাবাদ করতে পারেন কৃষক।
জেলা কৃষিসম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, মৌসুমি ও সাময়িক পতিত জমিতে চাষাবাদ করতে পারলে জেলায় ২ লাখ ৩৭ হাজার ৮৬০ মেট্রিকটন ধান উৎপাদন হতো। যার বাজার মূল্য ৩৫৭ কোটি টাকা। সেচের পানির অভাবে কৃষক এসব জমিতে বোরো ধান চাষ না করতে পারায় তারা চরম দারিদ্রতার মধ্যে দিয়ে দিন যাপন করছেন।
সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে প্রতিবছর এসব এলাকার জমিগুলো পতিত থাকে। পতিত জমির কারণে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষরা বলেন, খাল খনন কর্মসূচি তাদের কোনও কাজে না লাগায় জমিগুলো পতিত থাকে। ফলে তারা অভাব-অনটনে দিন কাটান।
দোয়ারা বাজার উপজেলার মান্নারগাঁও ইউনিয়নের হাজারিগাঁও গ্রামের চাষি আব্দুল মালেক (৩৪) বলেন, আগে খালবিল পানিতে পরিপূর্ণ থাকতো এখন এগুলো চৈত্রমাসের আগেও শুকিয়ে যায়। তাই তিন ফসলের জমিতে এক ফসল চাষ করি।
একই গ্রামের কৃষক আব্দুল মজিদ বলেন, দুই বছর আগে তাদের পতিত জমি চাষাবাদের জন্য হাজারিগাঁও গ্রামে জখাই খাল পুনখনন করা হয়েছিল। কিন্তু একবছর যেতে না যেতেই খালে পানি নেই।
আব্দুল লতিফ নামে আরেকজন বলেন, খালের সম্মুখ ভাগে পানি নিষ্কাশন ও পানি প্রবেশের রাস্তা না রেখে ছাতক দোয়ারাবাজার সড়ক নির্মাণ করার পর থেকে হাওরের এসব জমি পতিত পড়ে আছে। অথচ পার্শ্ববর্তী সুরমা নদী থেকে ডাবল লিফটিংয়ের মাধ্যমে খালে পানি সরবরাহ করা গেলে কৃষকের খুব উপকার হতো।
বাংলাদেশ ইউনিভারসিটি অব ইঞ্জিনিয়রিং অ্যান্ড টেকনোলজি (বুয়েটের) ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্ল্যাড ম্যানেজম্যান্ট বিভাগের অধ্যাপক কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে সরকারি বিভাগগুলোর সমন্বয়হীনতার জন্য এ সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করছে। এজন্য সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. জাহেদুল হক বলেন, সেচ সংকটের জন্য এসব জমি পতিত থাকে জেলার কৃষি ও কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। পতিত জমিগুলো চাষাবাদের আওতায় নিয়ে আসা হলে জেলার ৩০ লাখ মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন তরান্বিত হবে।
সুনামগঞ্জ বিএডিসি সেচ এর সহকারী প্রকৌশলী আবু আহমেদ মাহমুদুল হাসান বিএডিসি সেচ এর অনিয়মকে অস্বীকার করে বলেন, জেলার সেচের অভাবে পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় নিয়ে আসার জন্য ৪০ কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন ও বিভিন্ন ধরনের পাম্প দিয়ে ও সেচ নালা তৈরি করেছেন। কিন্তু আগাম বন্যার ফলে খাল ও সেচ নালা পলিভরাট হয়ে এর উপযোগিতা নষ্ট হয়ে যায়। জেলার সব পতিত জমি চাষাবাদেও আওতায় আনার জন্য বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
/এসটি/