নবীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ

৩ বছরের কমিটিতে ১০ বছর পার, কবে হবে সম্মেলন?

প্রায় ১০ বছর আগে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তিন বছর মেয়াদের কমিটি দিয়ে ইতোমধ্যে ১০ বছর কেটে গেছে। এখনও হয়নি সম্মেলন। সবশেষ ২০১৩ সালের সম্মেলনে ইমদাদুর রহমান মুকুলকে সভাপতি এবং সাইফুল জাহান চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। এরই মধ্যে ওই কমিটির অর্থ সম্পাদক মোতাহির মিয়া, ধর্ম সম্পাদক কাজী কাজল মিয়া, সদস্য আব্দুল মালিকসহ কয়েকজন নেতা মারা গেছেন। ৬৭ সদস্যের কমিটির সভাপতি মুকুল গত ইউপি নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় দল থেকে বহিষ্কার ও সাধারণ সম্পাদক সাইফুল জাহান পদত্যাগ করেন। ফলে এক বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আর ছয় মাস ধরে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক দিয়ে চলছে উপজেলা আওয়ামী লীগ। কয়েক দাফায় সম্মেলনের তারিখ দিলেও পরে তা রহস্যজনক কারণে পিছিয়ে যায়।

দলীয় নেতারা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল আগামী ২৪ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জাতীয় সম্মেলনের আগে দেশের মেয়াদোত্তীর্ণ ইউনিটগুলোতে সম্মেলন করে কমিটি পুনর্গঠন করার জন্য বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্তদের একাধিকবার তাগাদা দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। কিন্তু নবীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন কবে হবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না কেউ। এখনও সম্মেলনের তারিখ না দেওয়ায় তৃণমূলে প্রশ্ন উঠেছে, নবীগঞ্জ আওয়ামী লীগ নতুন নেতৃত্ব পাবে তো?

কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, সম্মেলন স্থগিতের পর নতুন তারিখ দেওয়া হয়নি। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক তারিখ দিলেই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। 

তবে জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ তারিখ দিলেই সম্মেলন হবে। কেন্দ্রীয় ও জেলার নেতাদের সম্মেলন নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মাঝে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। চাপা ক্ষোভও বিরাজ করছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, নবীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ইমদাদুর রহমান মুকুল ২০১৬ সালে গজনাইপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০২০ সালের ৭ জুলাই খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ২২৯ সুবিধাভোগীর চাল আত্মসাতের অভিযোগে মুকুলকে চেয়ারম্যান পদ থেকে বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। ওই বছরের ১৫ জুলাই মুকুলকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ থেকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়। আইনি লড়াই করেও শেষ পর্যন্ত চেয়ারম্যান পদে ফিরতে পারেননি। ২০২১ সালে তৃতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে নৌকা প্রতীক না পেয়ে মুকুল বিদ্রোহী প্রার্থী হন। পরে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় সিনিয়র সহ-সভাপতি গিয়াস উদ্দিন আহমদকে। পরে অবশ্য মুকুল চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

চলতি বছরের মার্চে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল জাহান চৌধুরীর বিরুদ্ধে জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় আবু জাহির এমপি ও গাজী মোহাম্মদ শাহনওয়াজ এমপির বাগবিতণ্ডার ঘটনার ভিডিও ধারণের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ২১ মে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি চেয়ে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি-সম্পাদকের কাছে লিখিত আবেদন করেন সাইফুল জাহান। পরে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। সেইসঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের সভায় উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গতি গৌবিন্দ দাশকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, প্রায় ১০ বছর পর গত ৩১ মার্চ নবীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করে জেলা আওয়ামী লীগ। এতে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দেয়। পরে অনিবার্য কারণ দেখিয়ে ১৭ মার্চ সম্মেলন স্থগিত করা হয়। কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশে সেপ্টেম্বর মাসে সম্মেলন করার জন্য সিদ্ধান্ত হয়। ফের সেপ্টেম্বর মাসে সম্মেলনের তারিখ স্থগিত করা হয়। দফায় দফায় তারিখ দিয়েও সম্মলেন না হওয়ায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় নেতাদের অভিযোগ, মূলত বিদ্রোহী ও বহিষ্কৃতদের সুপারিশে বারবার সম্মেলন পেছানো হচ্ছে। সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি গঠনে বিতর্কিত, বিদ্রোহীদের বাদ দিয়ে ত্যাগীদের মূল্যায়ন করতে হবে। ২৪ ডিসেম্বর জাতীয় সম্মেলনের আগে উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হওয়া জরুরি।

এ বিষয়ে নবীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক আহমেদ মিলু বলেন, ‘কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ ও জেলা আওয়ামী লীগ সম্মেলনের তারিখ নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে তৃণমূলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে। আশা করছি, দ্রুত সময়ে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব বের হয়ে আসবে।’

বারবার তারিখ দিয়েও সম্মেলন না হওয়ায় তৃণমূলে ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু সিদ্দিক বলেন, ‘নবীগঞ্জ আওয়ামী লীগের বিন্দুমাত্র কার্যক্রম নেই। তৃণমূলে ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। সম্মেলনের তারিখ নিয়ে জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য আমি শুনিনি। যদি এরকম হয়ে থাকে তাহলে বিষয়টি দলের জন্য মঙ্গলজনক নয়।’

উপজেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক থাকায় দলীয় কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়েছে জানিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফুল জাহান চৌধুরী বলেন, ‘তৃণমূল থেকে সম্মেলনের ব্যাপারে জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে অনুরোধ করা হলে সম্মেলনের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করেন। কিন্তু স্থানীয় এমপি শাহনওয়াজ মিলাদ বিভিন্ন ইউনিয়নে নিজের অনুসারী সৃষ্টি করতে না পারায় কেন্দ্রে অভিযোগ দেন। ফলে সম্মেলন পিছিয়ে যায়।’

এ ব্যাপারে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট গতি গোবিন্দ দাশ বলেন, ‘সম্মেলন স্থগিত করার পর নতুন তারিখ দেওয়া হয়নি। কবে সম্মেলন হবে তা কেন্দ্রীয় কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত ও জেলার নেতারা বলতে পারবেন।’

উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন করার জন্য কেন্দ্রের দিকে চেয়ে আছি উল্লেখ করে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আলমগীর চৌধুরী বলেন, ‘কেন্দ্রীয় নেতারা তারিখ দিলেই সম্মেলন হবে। বিদ্রোহী ও বহিষ্কৃতদের সুপারিশে সম্মেলন পেছানোর অভিযোগ ভিত্তিহীন। বিদ্রোহী ও বহিষ্কৃতরা আমার অনুসারী নয়। কারও কথায় সম্মেলন পেছানো হয়নি।’

কেন্দ্রীয় ও জেলার নেতাদের সম্মেলন নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের বিষয়ে হবিগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য গাজী মোহাম্মদ শাহনওয়াজ মিলাদ বলেন, ‘সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হওয়ার পক্ষে আমার অবস্থান। আমি চাই সম্মেলন দ্রুত হোক। আমি আওয়ামী লীগের ক্ষুদ্র কর্মী। সম্মেলন স্থগিত করার কোনও ক্ষমতা আমার নেই। কেন সম্মেলন স্থগিত করে রেখেছে তা কেন্দ্রীয় নেতারা বলতে পারবেন।’

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন বলেন, ‘জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক সম্মেলনের তারিখ না দেওয়ায় সম্মেলন হচ্ছে না। জেলা আওয়ামী লীগ সম্মেলনের তারিখ দিলে নবীগঞ্জ আওয়ামী লীগের সম্মেলন হবে। তবে বিদ্রোহী ও বহিষ্কৃতদের সুপারিশে সম্মেলন পেছানোর তথ্য সঠিক নয়।’