সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গৃহবধূকে তুলে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মামলায় খালাস পাওয়া নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের চার কর্মীকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) রাত সাড়ে ৮টার দিকে আদালতের রায়ের নির্দেশনা পৌঁছার পর আইনি প্রক্রিয়া শেষে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২ (পুরাতন কারাগার) থেকে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়। একইসঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্তদের পুরাতন কারাগার থেকে বাদাঘাটের নতুন কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে।
কারামুক্তরা হলেন- আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল, মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজন, রবিউল ও মাহফুজুর রহমান। তারা সবাই ছাত্রলীগের কর্মী। বাংলা ট্রিবিউনকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের (বন্দরবাজার) জেলার আরিফুর রহমান। তিনি বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তদের বাদাঘাট কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। পাশাপাশি খালাস পাওয়া চার জনকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।’
এর আগে দুপুরে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার এ মামলার রায় দেন। দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে তিনি এজলাসে আসেন। এরপর মামলার রায় পড়া শুরু করেন। বেলা ১টা ৫৩ মিনিটে রায় ঘোষণা করেন। মামলায় আট আসামির মধ্যে একজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। তিন জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও বাকি চার জন বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। তারা সবাই নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক কর্মী।
অভিযুক্ত সব আসামিকে কারাগার থেকে পুলিশের নিরাপত্তায় সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে আদালতে আনা হয়। রায় ঘোষণার সময় সব আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রায়ে মামলার প্রধান আসামি সাইফুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি, তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক ও অর্জুন লস্করকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অন্য চার আসামি আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল, মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজন, রবিউল ও মাহফুজুর রহমানকে বেকসুর খালাস দেন আদালত।
আলোচিত এই মামলায় রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্কের শুনানি শেষ হয় গত বুধবার। যুক্তিতর্ক শেষে আজ রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন আদালত। ঘটনার প্রায় ছয় বছরের মাথায় আজ রায় ঘোষণা করলেন বিচারক।
২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে ওই গৃহবধূকে (২০) সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর স্বামী শাহপরান থানায় ছয় জনের নাম উল্লেখ করে এবং দুজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন।
একই সময়ে পুলিশ ছাত্রাবাসে অভিযান চালিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো অস্ত্রসহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে। অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় ২৬ সেপ্টেম্বর পুলিশ বাদী হয়ে অস্ত্র ও চাঁদাবাজি আইনে আরেকটি মামলা করে।
ঘটনার পর আসামিরা পালিয়ে গেলেও তিন দিনের মধ্যে পুলিশ ও র্যাব অভিযান চালিয়ে ছয় আসামি ও সন্দেহভাজন দুজনকে গ্রেফতার করে। পরে তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
ডিএনএ পরীক্ষায় আট আসামির মধ্যে ছয় জনের সঙ্গে ধর্ষণের ঘটনার আলামতের মিল পাওয়া যায়। পরে ২০২০ সালের ৩ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহপরান থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।
২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি অপহরণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও এতে সহায়তার অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে আট জনের নামে একই আদালতে অভিযোগ গঠন করা হয়। ২০২২ সালের ১১ মে চাঁদাবাজি ও অস্ত্র আইনের মামলার অভিযোগেও ওই আট জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হয়। তারা সবাই তৎকালীন ছাত্রলীগ কর্মী এবং নগরের টিলাগড় এলাকাকেন্দ্রিক রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
মামলা দুটি নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল থেকে গত বছরের মে মাসে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর হয়ে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। মামলায় ২৫ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। এর মধ্যে গৃহবধূ, তার স্বামী, আসামিদের স্বীকারোক্তি নেওয়া ম্যাজিস্ট্রেট, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, এমসি কলেজের একজন অধ্যাপক, ওসমানী হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক সাক্ষ্য দেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, প্রধান আসামি সাইফুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া শাহ মো. মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি, তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক, অর্জুন লস্করকে ধর্ষণের দায়ে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া অপহরণের ঘটনায় যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত এই তিন জনকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। এ অভিযোগে তাদের ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড ও অনাদায়ে ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জরিমানার টাকা ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যরা প্রাপ্ত হবেন বলে রায়ে উল্লেখ করেছেন বিচারক।
এ ছাড়া অভিযুক্ত রবিউল হাসান ওরফে ইসলাম, মাহফুজুর রহমান ওরফে মাসুম, মো. আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল এবং মিছবাউল ইসলাম ওরফে রাজনের বিরুদ্ধে অভিযোগসমূহ প্রমাণিত না হওয়া বেকসুর খালাস দিয়েছেন আদালত।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, ভুক্তভোগীর স্বামী মামলা করার আগেই ঘটনাটি জানাজানি হয়। পুলিশ এ ঘটনায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিল। পরে ভুক্তভোগীর স্বামী এজাহার দিলেও বিচার ও তদন্তে সেই জিডির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করা হয়নি। আদালতের মতে, জিডিটি বিচারিক প্রক্রিয়ায় বিবেচনায় আনা প্রয়োজন ছিল।
মামলার অভিযোগকারী অর্থাৎ ভুক্তভোগীর স্বামী সাক্ষ্য দেওয়ার সময় এজাহারের কিছু বক্তব্য থেকে সরে গেলেও, ধর্ষণের ঘটনায় স্বামীর সম্মতি বা অসম্মতির কোনও আইনগত গুরুত্ব নেই বলে মন্তব্য করেন বিচারক। আদালত রায়ে বলেন, কোনও নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপনই ধর্ষণ। এমনকি কোনও যৌনকর্মীকেও তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাধ্য করা হলে সেটিও ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে।