হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পদযাত্রা কর্মসূচিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বুধবার (২৯ জুলাই) রাত ৮টার দিকে অভিযোগটি দাখিল করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাহুবল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রুহুল আমিন তালুকদার।
এ সময় নাহিদ ইসলাম ছাড়াও প্রতিনিধি দলে উপস্থিত ছিলেন মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, দক্ষিণ অঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ, ডা. মাহমুদা মিতু ও সারোয়ার আলম।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে মৌলভীবাজার সার্কিট হাউস থেকে এনসিপি নেতাদের বহনকারী গাড়িবহর হবিগঞ্জের পথে রওনা হয়। বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে চা-কন্যা এলাকায় একটি ট্রাক সড়কের ওপর আড়াআড়ি করে দিয়ে তাদের গাড়িবহর আটকে দেয় পুলিশ। এ সময় ট্রাক দিয়ে রাস্তা আটকে এবং ব্যারিকেড দেওয়া নিয়ে পুলিশের সঙ্গে এনসিপি নেতাদের ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে।
সেখানে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে শ্রীমঙ্গল থেকে হবিগঞ্জে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে আবার বাধার মুখে এনসিপির নেতারা। বিকা সোয়া ৫টার দিকে বাহুবল উপজেলার কামাইছড়া এলাকায় পৌঁছাতেই তাদের পথরোধ করে পুলিশ। সেখানে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা অবস্থানের পর কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে বসে অনলাইনে মামলার অভিযোগ দাখিল করেছেন নেতারা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হবিগঞ্জ পৌরসভা মাঠে ঘোষিত বিক্ষোভ সমাবেশে যোগ দিতে এনসিপির নেতারা জেলার উদ্দেশ্যে রওনা হলে বাহুবল উপজেলার কামাইছড়া এলাকায় পুলিশ তাদের গতিরোধ করে। সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সতর্ক অবস্থান নেয় প্রশাসন।
বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে এনসিপির গাড়িবহর শায়েস্তাগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল সড়কের ‘চা-কন্যা’ ভাস্কর্য এলাকায় পৌঁছালে পুলিশ সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে তাদের গতিরোধ করে। ট্রাক দিয়ে বাধা দেয়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে দলের কেন্দ্রীয় নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সারজিস আলমসহ নেতাকর্মীদের বাগবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে পুলিশ ও এনসিপির নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। পরে নেতাকর্মীরা পুলিশকে ঠেলে গাড়িবহর সামনে এগিয়ে যান।
কিছু দূর যাওয়ার পর বাহুবল উপজেলার রশিদপুর গ্যাস ফিল্ড এলাকায় আবারও পুলিশের বাধায় গাড়িবহর আটকা পড়ে। পরে নাহিদ ইসলামসহ নেতাকর্মীরা গাড়ি থেকে নেমে সড়কে বসে পড়েন। দীর্ঘ আলোচনার পর পুলিশ এনসিপির নেতৃবৃন্দকে কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে অভিযোগ করার অনুমতি দেয়। এরপর সেখানে গিয়ে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন এনসিপি নেতারা।
এনসিপির নেতারা জানান, আগের দিনের হামলার ঘটনায় তারা হবিগঞ্জ সদর থানায় গিয়ে মামলা করতে চেয়েছিলেন। তবে পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা কার্যকর থাকায় পুলিশ তাদের শহরে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। পরে দীর্ঘ আলোচনার পর কামাইছড়া পুলিশ ক্যাম্প থেকেই অনলাইনে অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ১৪৪ ধারা বলবৎ থাকায় পৌর এলাকায় সভা-সমাবেশ, মিছিল ও জনসমাগম নিষিদ্ধ রয়েছে। সম্ভাব্য সংঘর্ষ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় এনসিপির নেতাকর্মীদের জেলা শহরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। ঘটনাস্থলে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কয়েক দফা আলোচনা হয়। দীর্ঘ সময় অবস্থানের পর পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ থাকলেও সেখানে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন ছিলেন।
এর আগে পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য সংঘর্ষের আশঙ্কায় মঙ্গলবার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ড. জি. এম. সরফরাজ স্বাক্ষরিত গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে হবিগঞ্জ পৌর এলাকায় বুধবার বিকাল ৩টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।
গত মঙ্গলবার কর্মসূচি শেষে ফেরার পথে বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা হবিগঞ্জ শহরে হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেছেন এনসিপি নেতারা। এতে বেশ কয়েকজন আহত হন। এ ঘটনা নিয়ে বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে টান টান উত্তেজনার মধ্যে বুধবার সকাল থেকে হবিগঞ্জ পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হবিগঞ্জ শহরের টাউন হলের সামনে পদযাত্রা শেষে ফেরার পথে এনসিপির নেতাদের বহনকারী গাড়িতে স্থানীয় ছাত্রদল নেতাকর্মীরা অতর্কিত হামলা চালান। এ সময় সাংবাদিকদের কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এ ঘটনায় আহত হন দলটির কয়েকজন নেতাকর্মী। এ সময় দলটির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম ও মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী হামলা থেকে বাঁচতে সোনালী ব্যাংকে গিয়ে আশ্রয় নেন। পরে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে নিয়ে যায়। রাতে তারা মৌলভীবাজারে অবস্থান করেন। এর মধ্যে বুধবার এনসিপি তাদের পূর্বঘোষিত মৌলভীবাজার জেলায় দুটি ‘জুলাই পদযাত্রা’ সাময়িক স্থগিত করে হবিগঞ্জ শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের ঘোষণা দেয়। অন্যদিকে জেলা ছাত্রদল ও বিএনপির পৃথক কর্মসূচির ঘোষণাকে কেন্দ্র করে শহরে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়।