সিলেটে দম্পতি ও গৃহপরিচারিকা হত্যা

৪ দিনের রিমান্ডে বাবুল মিয়া: সেদিন বাসায় কারা এসেছিল, তদন্ত করছে পুলিশ

সিলেট নগরের রায়নগর মিতালি আবাসিক এলাকায় এক দম্পতি ও গৃহপরিচারিকা হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার বাবুল মিয়াকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। রবিবার (১৬ আগস্ট) বেলা ১১টার দিকে তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফারহানা সুলতানার আদালতে হাজির করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড চায় পুলিশ। শুনানি শেষে চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) মিডিয়া অফিসার অতিরিক্ত উপকমিশনার মনজুরুল আলম। তিনি বলেন, ‘বাবুল মিয়ার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।’

এসএমপির উপকমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনার তদন্তে কোনও ফাঁকফোকর রাখা হবে না। একইসঙ্গে মামলার বাদী সেলিনা সুলতানার অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ। এর রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। মামলার এজাহারে বাদী যেসব অভিযোগ করেছেন, সেগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হবে। এর সঙ্গে ফরেনসিক ইস্যু ও ডিজিটাল প্রমাণ, সন্দেহভাজনদের যোগসাজশ সবকিছু তদন্ত করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘বাবুল মিয়াকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো ও রিমান্ডে নেওয়ার মধ্য দিয়ে মূলত মামলার তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সেদিন বাসায় ঘটনার আগে-পরে কারা এসেছিল, তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হবে। নিহতের ছেলে বিদেশ থেকে বাসার সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ন্ত্রণ করতো। তদন্তকালে তার কাছে থাকা ফুটেজও বিশ্লেষণ করা হবে। গৃহপরিচারিকার শরীরে ২১টি আঘাতের চিহ্ন ও তার হাতের আঙুল কাটা ছিল। মেয়েটির প্রতি বাবুল মিয়ার কোনও আক্রোশ ছিল কিনা, সেটাও তদন্তে উঠে আসবে। তদন্তকালে পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে শুরু করে কোনও বিষয় বাদ দেওয়া হবে না। সবকিছু এর মধ্যে আসবে।’

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) উপপরিদর্শক শিপলু চৌধুরী বলেন, ‘বাদীর এজাহারকে বিশ্লেষণ করে অন্যান্য আসামিকে গ্রেফতারের জন্য কাজ করছি আমরা।’

গত বুধবার বেলা ১১টার দিকে রায়নগর মিতালি আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলা থেকে আবদুস সাত্তার (৮২), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) এবং তাদের গৃহপরিচারিকা তাহমিনার (২০) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তিন জনের শরীরেই ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল। গত শুক্রবার বিকালে সিলেট নগরের শাহি ঈদগাহ মাঠে নিহত দম্পতি আবদুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাদের মানিক পীর কবরস্থানে দাফন করা হয়।

নিহত আবদুস সাত্তারের এক ছেলে ও তিন মেয়ে। তারা সবাই প্রবাসে থাকেন। ছেলে ও এক মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এবং দুই মেয়ে যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন। একসময় তিনি সিলেট নগরের কালীঘাট এলাকায় পাইকারি মাল কেনাবেচার ব্যবসা করতেন। পরে আম্বরখানা এলাকায় মানি এক্সচেঞ্জের ব্যবসাও করেন।

গত শুক্রবার রাতে এ ঘটনায় মামলা করেছেন নিহত দম্পতির যুক্তরাজ্যপ্রবাসী মেয়ে সেলিনা সুলতানা। মামলার এজাহারে তিনি বলছেন, জমি নিয়ে বিরোধ ও মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকির ধারাবাহিকতায় পূর্বপরিকল্পিতভাবে ভাড়াটে খুনি দিয়ে তার মা-বাবা ও গৃহকর্মীকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

এজাহারে সেলিনা সুলতানা অভিযোগ করেন, তার বাবা এম এ সাত্তার ১৯৯৭ সালে সিলেটের পুলিশ লাইনস লুসাই গির্জা সমিতির কাছ থেকে রিকাবীবাজারের সরফপুর এলাকায় প্রায় ১২ শতক জমি ইজারা নিয়ে সেখানে বসবাস করছিলেন। ২০০৬ সালে ইম্পালস বিজনেস লিমিটেডের (আবাসন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান) চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম ওই জমিসহ সমিতির আরও জমি তার প্রতিষ্ঠানের নামে দলিল করে মালিকানা দাবি করেন। এ নিয়ে তাদের উচ্ছেদের হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় তার বাবা ২০১৬ সালে সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাকে ও তার বাবাকে বিভিন্ন সময় হুমকি দেওয়া হয়। এ নিয়ে তার বাবা সাধারণ ডায়েরিও করেছিলেন। জমি নিয়ে বিরোধের জেরে কয়েকটি মামলা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। মামলাগুলো প্রত্যাহারের জন্য সিরাজুল ইসলাম বিভিন্ন সময় তার বাবা ও তাকে হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন সেলিনা।

এজাহারে একাধিক হুমকির অভিযোগের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি বিকালের একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে এজাহারে বলা হয়, সিরাজুল ইসলাম, আমিন হোসেনসহ কয়েকজন তাদের বাসায় গিয়ে মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দেন। তারা মামলা প্রত্যাহারে অস্বীকৃতি জানালে দুই পক্ষের মধ্যে তর্কবিতর্ক হয়। একপর্যায়ে তাদের দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে তারা চলে যান। এ ঘটনায় সেলিনা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন।

সর্বশেষ গত ২৮ ও ৩০ জুলাই আদালত প্রাঙ্গণে এম এ সাত্তারকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দেওয়া হয়। এসব বিরোধ ও হুমকির ধারাবাহিকতায় পূর্বপরিকল্পিতভাবে ভাড়াটে খুনি দিয়ে তার বাবা, মা ও গৃহকর্মীকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। হত্যার পর বাসা থেকে বিভিন্ন কাগজপত্র, জিডির কপি ও জমিসংক্রান্ত দলিলপত্র নিয়ে যাওয়া হয়েছে।