সড়কের কাজ ফেলে উধাও ঠিকাদার, এলজিইডির শোকজ

নির্ধারিত সময়সীমা পার হয়ে গেলেও কাজের অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশ। সরকারি পৌনে ৬ কোটি টাকার বরাদ্দ বাগিয়ে নিয়ে চরম গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়ে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের কাজ অর্ধসমাপ্ত রেখেই উধাও হয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ফলে পর্যটন নগরী ও চা-শিল্পসমৃদ্ধ এই অঞ্চলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘রাধানগর-মোহাজেরাবাদ’ সড়কটি এখন বিশালাকার খানাখন্দ আর কাদাপানিতে ভরা এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।

উন্নয়ন কাজের নামে এমন স্বেচ্ছাচারিতা ও জনভোগান্তির মুখে অবশেষে কঠোর অবস্থান নিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি)। চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের দায়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কড়া কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব ও কাজের লিখিত পরিকল্পনা জমা না দিলে ব্যাংকে রক্ষিত লাখ লাখ টাকার জামানত বাজেয়াপ্ত, চুক্তি বাতিল এবং লাইসেন্স স্থায়ীভাবে কালো তালিকাভুক্ত (ব্ল্যাকলিস্ট) করার চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

মৌলভীবাজার এলজিইডির প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ‘গ্রাম সড়ক পুনর্বাসন প্রকল্প (২য় পর্যায়)’-এর অধীনে শ্রীমঙ্গল জিসি (রাধানগর) থেকে বিষামনি বাজার হয়ে মোহাজেরাবাদ বাজার পর্যন্ত ৫ দশমিক ৮৬ কিলোমিটার (৫ হাজার ৮৬০ মিটার) সড়ক পুনর্বাসনের কাজটি পায় বরিশালের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স কোহিনুর এন্টারপ্রাইজ। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মেহেদী হাসান চৌধুরী।

প্রকল্পটির প্রাক্কলিত বাজেট ৬ কোটি ২৬ লাখ ৯১ হাজার টাকা হলেও চূড়ান্ত চুক্তি হয় ৫ কোটি ৮৫ লাখ ৫২ হাজার ৫৫১ টাকায়। আর জামানত হিসেবে ব্যাংকে রক্ষিত রয়েছে ২৯ লাখ ২৭ হাজার ৬২৭ টাকা।

চুক্তি অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল কার্যাদেশ প্রদান করে ১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু মেয়াদ শেষ হলেও ৮০ শতাংশ কাজই বাকি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ থাকলেও ঠিকাদারের কোনও খোঁজ নেই।

গত ১২ সেপ্টেম্বর শ্রীমঙ্গল এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী (নকশাকার) সঞ্জয় কুমার পণ্ডিত সরেজমিনে সাইট পরিদর্শনে গিয়ে দেখেন, পুরো প্রকল্প এলাকা অরক্ষিত। সাইটে শ্রমিক তো দূরের কথা, ঠিকাদারের কোনও প্রতিনিধিও উপস্থিত ছিলেন না। বারবার যোগাযোগ করা হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরুর কোনও উদ্যোগ নেয়নি।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লাগাতার গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৪ সেপ্টেম্বর শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রকৌশলী আবদুর রাকিব স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ঠিকাদারকে কারণ দর্শানোর জন্য নোটিশ দেওয়া হয়।

চিঠিতে বলা হয়, কোনও যৌক্তিক কারণ ছাড়াই টানা ২৮ দিনের বেশি কাজ বন্ধ রাখা চুক্তির শর্তের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তাই চিঠি পাওয়ার তিন কার্যদিবসের মধ্যে উপসহকারী প্রকৌশলীর উপস্থিতিতে গুণগত মান বজায় রেখে কাজ শেষ করার লিখিত কর্মপরিকল্পনা (ওয়ার্ক প্ল্যান) জমা দিতে ঠিকাদারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কর্মপরিকল্পনা জমা না দিলে জামানত বাজেয়াপ্তসহ লাইসেন্স বাতিলের আইনানুগ সুপারিশ করা হবে বলেও চিঠিতে সতর্ক করা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বিশ্বখ্যাত পাঁচ তারকা হোটেল ‘গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ’-এর সামনে দিয়ে চলে যাওয়া এই সড়কটি শ্রীমঙ্গলের অর্থনীতি ও পর্যটনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। প্রতিদিন হাজারো দেশি-বিদেশি পর্যটক ও শত শত যানবাহন এই সড়ক দিয়ে চলাচল করে।

সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় মুমূর্ষু রোগী কিংবা গর্ভবতী নারীদের হাসপাতালে নেওয়া এখন ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে স্থানীয় চা-শিল্প ও কৃষিখাতেও। সময়মতো কাঁচা চা-পাতা কারখানায় পৌঁছাতে না পেরে ক্ষতির মুখে পড়ছেন বাগান মালিকরা। এ ছাড়া রাধানগর অঞ্চলের লেবু ও আনারস চাষিরা উৎপাদিত পণ্য সময়মতো বাজারজাত করতে না পেরে দ্বিগুণ পরিবহন খরচ গুনতে বাধ্য হচ্ছেন।

ঠিকাদারের এমন উদাসীনতায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন এলাকাবাসী। সম্প্রতি জরুরি বৈঠক ডেকে এলাকাবাসীর একটি প্রতিনিধি দল উপজেলা প্রকৌশলীর সঙ্গে দেখা করে অবিলম্বে মূল সড়কের কাজ শেষ করা এবং বিকল্প চলাচলের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন। দাবি মানা না হলে কঠোর আন্দোলন ও অবরোধ কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তারা।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স কোহিনুর এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মেহেদী হাসান চৌধুরীর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে অপর প্রান্ত থেকে এক ব্যক্তি নিজেকে তার ভাই পরিচয় দিয়ে জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জয় নামের এক ব্যক্তি তাদের হয়ে কাজটি করছেন। বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে পরে জানাবেন বলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন তিনি। এরপর একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রকৌশলী আবদুর রাকিব বলেন, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করায় এবং ২০ শতাংশ অগ্রগতি রেখেই কাজ ফেলে রাখায় ঠিকাদারকে শোকজ করা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব ও কর্মপরিকল্পনা না পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত ও ব্ল্যাকলিস্ট করার কঠোর সুপারিশ পাঠানো হবে।

মৌলভীবাজার এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফাররুক আহমদ জানান, ঠিকাদারের এই গাফিলতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া করা হবে না। শোকজের নির্ধারিত সময়ে জবাব না মিললে চুক্তি বাতিল করে দ্রুত নতুন দরপত্রের মাধ্যমে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করা হবে।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিয়াউর রহমান বলেন, জনদুর্ভোগ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। সংশ্লিষ্ট দফতরের সঙ্গে কথা হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে নতুন প্রক্রিয়ায় অবশিষ্ট কাজ শেষ করার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।