সরকারের ভুলের দায় বিরোধী দল কেন নেবে: জামায়াত আমির

সরকারের কর্মকাণ্ডে ভুল-ত্রুটি থাকলে তার দায় বিরোধী দলের ওপর চাপানোর সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।

তিনি বলেছেন, সংসদে তারা দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে চান। সরকার জনকল্যাণমূলক কোনও উদ্যোগ নিলে তাতে সহযোগিতা করবেন, কিন্তু অনিয়ম ও ভুলের ক্ষেত্রে সমালোচনা করতেও দ্বিধা করবেন না।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) দুপুরে মৌলভীবাজার সার্কিট হাউসে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, সংবাদমাধ্যম, প্রবাসীদের সমস্যা এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেন জামায়াত আমির।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশে একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেও বিরোধী দল নীরব থাকবে এমনটা হতে পারে না। সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তে সমর্থন দেওয়া কিংবা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা কোনোটিই তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নয় বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, অতীতে রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন প্রবণতা দেখা গেছে, যেখানে ক্ষমতাসীনদের সব কাজকে ইতিবাচক এবং বিরোধীদের সব কর্মকাণ্ডকে নেতিবাচকভাবে দেখা হতো। তিনি এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার ওপর গুরুত্ব দেন।

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে জামায়াত আমির বলেন, পুলিশের মধ্যে দায়িত্বশীল ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা থাকলেও সার্বিক পরিস্থিতির আরও উন্নতি প্রয়োজন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে আরও মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও মাদকবিরোধী কার্যক্রমে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

জেলা পরিষদে দায়িত্ব বণ্টন এবং সরকারি কর্ম কমিশনকে (পিএসসি) ঘিরে দলীয়করণের অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার মতে, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। জেলা পরিষদে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়ার পরিবর্তে সাময়িকভাবে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া যেত কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি

দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিকে রাজনৈতিক দলের ভাবমূর্তি নষ্টের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তার বক্তব্য, এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিরা সংশ্লিষ্ট দলের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ান। তাই তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, জনপ্রতিনিধি কিংবা মন্ত্রী যেই হোন না কেন, গুরুতর অপরাধের অভিযোগ উঠলে তা যথাযথভাবে তদন্ত করা উচিত। অপরাধ প্রমাণিত হলে পদমর্যাদা বিবেচনা না করে ব্যবস্থা নিতে হবে। ভুল সংশোধনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে, তবে অপরাধের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার নীতি গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নিজ দলের এক সংসদ সদস্যকে বহিষ্কারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান জানান, ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে দলীয় সিদ্ধান্ত নিতে তাদের বেশি সময় লাগেনি। বহিষ্কারের পর তার সঙ্গে দলের আর কোনও সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

দেশের বিভিন্ন ঘটনা ও অনিয়ম জনসমক্ষে তুলে ধরতে সংবাদমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে মন্তব্য করেন জামায়াত আমির। একই সঙ্গে অতীতে ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠার পেছনে গণমাধ্যমেরও কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

সাংবাদিকদের আরও সাহসী, দায়িত্বশীল ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সংবাদমাধ্যমকে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। দেশের বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

বাংলাদেশকে সব নাগরিকের দেশ উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও বৈচিত্র্যপূর্ণ সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সহমর্মিতা বজায় রাখা জরুরি। রাজনৈতিক পরিচয় বা ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কেউ যেন নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগেন, সে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

সম্প্রতি দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, দেশের মানুষ শান্তিতে থাকলে সবাই উপকৃত হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা। ক্ষমতা স্থায়ী নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ক্ষমতা অর্জনই তাদের রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য নয়; বরং দেশবাসীর ভালো থাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

সৌদি আরবের কারাগারে সাত হাজারের বেশি বাংলাদেশি বন্দী থাকার কথা উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, দেশটির আইন অনুযায়ী তাদের বিচার হবে। তবে বন্দীদের অবস্থা ও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারের খোঁজখবর রাখা প্রয়োজন। তারা ন্যায়বিচার পাচ্ছেন কি না, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবগত থাকা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিমানবন্দরে লাগেজ পেতে আগের তুলনায় সময় কম লাগার বিষয়টি উল্লেখ করে প্রবাসীদের আন্দোলনের সফলতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সরকারের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন বলে জানান জামায়াত আমির।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান জানান, তাদের দল জোটগতভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে না। অতীতেও তারা এভাবে নির্বাচনে অংশ নেননি বলে উল্লেখ করেন তিনি। ভবিষ্যৎ নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান জামায়াতের আমির।

মতবিনিময় সভায় তিনি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি এবং জনগণের অধিকার রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।