এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিদ্যমান পদ্ধতিতে শতভাগ নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়। তবে এবার যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাতে ভালো ফল পাওয়া যাবে।’
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ‘বিদ্যমান ব্যবস্থায় প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ শতভাগ নিশ্চিত না হলেও এবার দৃশ্যত ভালো হবে।’
প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে করণীয় নির্ধারণে হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত কমটির আহ্বায়ক বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ী ট্রেজারি থেকে প্রশ্নপত্র আনার সময় ফাঁস হয়। ঘটনা যদি সেটাই হয়, তাহলেই কেবল পরীক্ষা শুরুর ২৫ মিনিট আগে প্রশ্নের সেট নির্ধারণ সিদ্ধান্তটি কাজে আসবে। আর যদি আগেই ফাঁস হয়ে থাকে, তাহলে সেটা কোনও কাজেই আসবে না।’
এই শিক্ষাবিদ আরও বলেন, ‘বিগত সময় পরীক্ষার অন্তত একমাস আগেই দুই সেটের মধ্যে কোন সেটে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে, সেই সেটটি নির্ধারণ করা হতো। সে কারণে যদি পরীক্ষার শুরুর কয়েক দিন আগে নির্ধারিত সেই সেটটির প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়, তাহলে পরীক্ষার্থীরা তা হাতে পেতো। এরপর তা পড়ে এসে পরীক্ষা দিতো। আর একই নিয়মে যদি এবারও কয়েকদিন আগে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়, তাহলে হয়তো কষ্ট দ্বিগুণ হবে পরীক্ষার্থীদের। প্রশ্ন একটি সেটের বদলে দুটি সেটই পড়ে আসতে হবে। কিন্তু তাতে তো প্রশ্নফাঁস রোধ হলো না।’
এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী গণমাধ্যমকে আগেই জানিয়েছেন, ‘বিজি প্রেস থেকে আগে প্রশ্নপত্র ফাঁস হলেও জনবল কমানো ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ায় তা রোধ করা সম্ভব হয়েছে।’
এইচএসসি পরীক্ষার্থী অভিভাবক ও কলেজ শিক্ষক আফরোজা সুলতানা দীপ্তি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে সরকার তো এসএসসিতেও নানা পদক্ষেপ নিয়েছিল, কিন্তু ঠেকাতে পারেনি। পরীক্ষার ২৫ মিনিট আগে সেট নির্ধারণ করলেও প্রশ্নপত্র যদি কয়েক দিন আগেই ফাঁস হয়, তাহলে তো এই পদ্ধতিও কোনও কাজে আসবে না।’
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রের সেট পরীক্ষার আগে নির্ধারণ, দায়িত্ব বণ্টন, সিকিউরিটি বাড়ানোসহ সাত দফা নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। সাত দফা ছাড়াও আরও কিছু নির্দেশনাসহ মঙ্গলবার (২৭ মার্চ) পাঁচটি পরিপত্র জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এসব পরিপত্রে বলা হয়, পরীক্ষার চার দিন আগে ২৯ মার্চ থেকে পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সব ধরনের কোচিং সেন্টার বন্ধ থাকবে। পরীক্ষায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছাড়া পরীক্ষা কেন্দ্রের ২০০ মিটারের মধ্যে কেউ মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবেন না। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যে মোবাইল ফোন সেটে ছবি তোলা যায় না এবং ইন্টারনেট সুবিধা নেই সে রকম ফোন ব্যবহার করতে পারবেন। মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিক ডিভাইস বা প্রশ্ন দেখতে কোনও বস্তু পাওয়া গেলে তাকে আটক করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরীক্ষা চলার সময় পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট কোনও ব্যক্তি ছাড়া কেন্দ্রে কেউ প্রবেশ করতে পারবেন না। পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিট পরে কোনও পরীক্ষার্থী কেন্দ্রে এলে তার নাম রোল নম্বর, প্রবেশের সময় ও দেরিতে আসার কারণ রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করতে হবে। পরীক্ষার দিনই তা সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবোর্ডকে জানাতে হবে।
প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে সাত দফা
সব সেট প্রশ্নপত্রই যাবে কেন্দ্রে। প্রত্যেক কেন্দ্রে প্রতি বিষয়ের/পত্রের প্রতিটি সেটের জন্য একটি খাম থাকবে। খাম সিলগালা নয়, সিকিউরিটি টেপ দিয়ে আটকানো থাকবে। জেলা প্রশাসকরা পরীক্ষা শুরুর আগে যেকোনও দিন ট্রেজারিতে এই কাজ সম্পন্ন করবেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার/নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সিকিউরিটি টেপ লাগাতে হবে।
প্রত্যেক কেন্দ্রের জন্য একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট/দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নিয়োজিত থাকবেন। ট্রেজারি বা থানা থেকে কেন্দ্র সচিবসহ পুলিশ পাহারায় কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র পৌঁছাতে হবে। সেটকোড পরীক্ষা শুরুর ২৫ মিনিট আগে জানিয়ে দেওয়া হবে। সেই অনুযায়ী নির্ধারিত সেটকোডে পরীক্ষা নিতে হবে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বা দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, কেন্দ্র সচিব ও পুলিশ কর্মকর্তার উপস্থিতি ও স্বাক্ষরে বিধি অনুযায়ী প্রশ্নপত্রের প্যাকেট খুলতে হবে।
প্রতিটি কেন্দ্রের জন্য একজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বা দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নিয়োজিত থাকবেন। ট্রেজারি বা থানা থেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে কেন্দ্র সচিবসহ প্রশ্নপত্র গ্রহণ করে পুলিশ পাহারায় কেন্দ্রে নিতে হবে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ কর্মকর্তার উপস্থিতি ছাড়া প্রশ্ন বের করা যাবে না।
দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, কেন্দ্র সচিব ও পুলিশ কর্মকর্তার উপস্থিতি ও স্বাক্ষরে বিধি অনুযায়ী প্রশ্নের সেট খুলতে হবে।
পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিট আগে পরীক্ষার্থীকে কেন্দ্রে প্রবেশ করে আসনে বসতে হবে। এ বিষয়টি মনিটরিং করা হবে।
কেন্দ্র সচিব ছাড়া কেউ যেন মোবাইল ফোন বা ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। কেন্দ্র সচিব শুধু একটি সাধারণ মোবাইল (ছবি তোলা যাবে না এমন) ফোন ব্যবহার করতে পারবেন।
অনিবার্য কারণে কেউ পরীক্ষা শুরু করতে দেরি হলে কেন্দ্র সচিব পরীক্ষা শুরুর সময় থেকে প্রশ্নপত্রে উল্লিখিত নির্ধারিত সময় পর্যন্ত পরীক্ষা নেবেন।