হেলে পড়া নতুন বিদ্যালয় ভবন এখন ‘পরিত্যক্ত’

নির্মাণকাজ শেষ না হতেই চার-পাঁচ ইঞ্চি হেলে পড়ে বিদ্যালয় ভবন। এ কারণে কোনও কাজে আসছে না খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার নির্মাণাধীন পল্লীশ্রী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন চারতলা একাডেমিক ভবন। এক বছর ধরে ভবনটি এখন ‘পরিত্যক্ত’। হেলে পড়া অবস্থা থেকে সোজা করার চেষ্টা করেও কোনও লাভ হয়নি।

প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বিদ্যালয়ের নতুন ভবনটির দায় নেবে কে, তারও কোনও হদিস নেই। সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতনরা বিষয়টি নিয়ে কোনও কথা বলতেও চান না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের (ইইডি) বাস্তবায়নাধীন ‘নির্বাচিত মাধ্যমিক বিদ্যালয়সমূহে উন্নয়ন‘ প্রকল্পের আওতায় পল্লীশ্রী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের চারতলা একাডেমিক ভবন নির্মাণকাজের দরপত্র আহ্বান করা হয় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে। এর নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ২ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার টাকা। কিন্তু কাজ শেষ না হতেই ভবনটি পাঁচ থেকে ছয় ইঞ্চি হেলে পড়ে। বিষয়টি নজরে এলে কাজ বন্ধ রাখা হয়।

২০২২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ইইডির তিন সদস্যবিশিষ্ট কারিগরি দল ভবনটি পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ করে। পরে ভবন হেলে পড়া ঠেকানো ও সোজা করতে সঠিক পদ্ধতিতে কাজ করতে ঠিকাদারসহ সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয় ইইডি থেকে।

নির্দেশনা অনুযায়ী ভবনটির যে পাশ হেলে গেছে, তার বিপরীত পাশে আনুমানিক ১৪ ফুট গভীর পর্যন্ত মাটি খনন করা হয়। অন্য পাশে বাঁশের পাইলিং দিয়ে ১২ ফুট চওড়া ও ১৪ ফুট উঁচু বাঁধের মতো করে নির্মাণ করা হয়।

এভাবেই ভবনের কাজ শেষ না করে ফেলে রাখা হয়। এক বছরে বেশি সময় পার হয়ে গেলেও ভবন সোজা হয়নি। ফলে এক বছর ধরে পড়ে থাকায় ভবনটিতে নতুন করে ফাটল ধরেছে, এমন অভিযোগও উঠেছে।

নির্মাণকাজ চলাকালে শিক্ষা প্রকৌশলের খুলনা জোন অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন শেখ নাসিম রেজা। তার বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে ‘গাফিলতি’ ও ঘটনা ‘ধামাচাপা’ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এরপর তাকে রাজশাহী জোন অফিসে বদলি করা হয়।

জানতে চাইলে প্রকল্প কর্মকর্তা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সমীর কুমার রজক দাস বলেন, ‘ভবনটি ব্যবহার করা হচ্ছে না। তবে ভবনে ফাটল ধরেছে, এমনটি আমি শুনিনি। ভবনের কাজ করা শেষ হয়নি, তাই ভবনটি ব্যবহার করা হচ্ছে না। ভবনটির কাজ করবে (ঠিকাদার) মনে হয়।’

ভবনের কাজ কবে নাগাদ শেষ হবে, জানতে চাইলে প্রকল্প কর্মকর্তা বলেন, ‘খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী ভালো বলতে পারবেন, কাজের গতি কী?’

হেলে পড়া ভবনের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে খুলনা সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী মু. মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেনি। এ ছাড়া মোবাইল ফোনে মেসেজ দিলেও তিনি কোনও জবাব দেননি।

এ বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী মো. দেলোয়ার হোসেন মজুমদারের সঙ্গে দুই দিন ধরে যোগাযোগ করা চেষ্টা করলেও, তিনি ফোন ধরেননি। মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপেও মেসেজ দিলে কোনও উত্তর দেননি।

অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নেওয়া হয়নি ব্যবস্থা
ভবন নির্মাণে দুর্নীতি ও গাফিলতির জন্য কারও শাস্তি হয়নি। এমনকি এ-সংক্রান্ত তদন্ত হলেও প্রতিবেদন প্রভাবশালীদের চাপে ধামাচাপা পড়ে রয়েছে।

জানা গেছে, নকশাবহিভূর্তভাবে ‘বালি ফিলিং’ করে ভবন নির্মাণের কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণও বলা হয়েছে। আর সে কারণে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আনা হয়নি।

গত বছরের ২৮ জুন স্কুল ভবন হেলে পড়ার ঘটনায় শিক্ষা প্রকৌশল খুলনা সার্কেলের ওই সময়ের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মারুফ আল ফারুকীর নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন নির্বাহী প্রকৌশলী (প্রধান কার্যালয়) মীর মুয়াজ্জেম হুসেন, নির্বাহী প্রকৌশলী (খুলনা) মোস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) এস এম সাফিন হাসান ও সহকারী প্রকৌশলী রতিশ চন্দ্র সেন।

ভবন সোজা হবে না
জানা গেছে, এই কমিটির প্রতিবেদনে কয়েকটি পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এগুলো হচ্ছে নির্মাণাধীন চারতলা ভবনটি প্রায় চার থেকে পাঁচ ইঞ্চি পরিমাণ হেলে গেছে। এত বড় অপরাধকে ধামাচাপা দেওয়ার লক্ষ্যে ভবনটির দুই পাশে এবং বারান্দায় বস্তায় মাটি ভরাট করে লোড চাপানো আছে ও সম্মুখে চার মিটার গভীর ও তিন মিটার চওড়া পরিখা খনন করা আছে, লোক দেখানো কাজ চলমান আছে। ভিত তৈরির কাজের জন্য সরবরাহ করা ড্রইং ও ডিজাইনের নির্দেশনার সঙ্গে স্যান্ড কুশন ফাউন্ডেশন লেভেল, ফুটিং থিকনেস এবং পিডেস্টাল কলাম হেইটের কোনও মিল পাওয়া যায়নি। সম্পূর্ণ নকশাবহির্ভূতভাবে অনিয়ম করে বালি ফিলিং, বেইজের থিকনেস এবং পিডেস্টাল কলাম হেইট কম করে অনিয়ম করা হয়েছে।

পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, হেলে পড়ায় ভবনটি কোনোভাবেই সোজা করা সম্ভব নয় বা এটাকে দুই পাশে গর্ত করে বা ধামাচাপা দিয়ে কোনোরকম সোজা করা হলেও তা পুরো সোজা হবে না। কোনোরকম সোজা হলেও এটা ভবিষ্যতে আবার বাঁকা হবে বা হেলে পড়ে যাবে। আর এটিকে কখনোই আগের অবস্থায় আনা সম্ভব নয়। এ ছাড়া ভবনটি যেহেতু ঝুঁকিপূর্ণভাবে হেলে আছে, যে কোনও সময় এটা ভেঙে পড়ে যেতে পারে।

তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা ইইডির নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম সাফিন বলেন, ‘এক বছর আগে দাখিল করা হয়েছে। এখন তো বলতে পারবো না। তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবের সঙ্গে আলাপ করতে পারেন। অথবা যেখানে প্রতিবেদন জমা আছে, সেখান থেকে জানতে পারেন।’

আরও পড়ুন:

হেলে পড়া বিদ্যালয় ‘সোজা’ করার চেষ্টা