জুলাই অভ্যুত্থানে আহত-নিহতদের পরিবারের জন্য কোটা নাকি ‘বিশেষ সুবিধা’?

২০২৪ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনই পরে ‍রূপ নিয়েছিল সরকার পতনের আন্দোলনে। জুলাই-আগস্ট মাসে ‘ছাত্র-জনতার’ সেই তীব্র আন্দোলনে পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের। পরে সেই জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের জন্য সরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এবার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও একই ধরনের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ভর্তির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে।

পাশাপাশি, গত ২৯ মে থেকে শুরু হওয়া জিএসটি (জেনারেল, সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি) গুচ্ছভুক্ত ১৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন ভর্তি কার্যক্রমেও ওই ‘বিশেষ সুবিধার’ বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই ‘বিশেষ সুবিধা’ দেওয়া হচ্ছে অনলাইন ভর্তির ‘কোটা অপশনের’ অধীনে, যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, কোটাবিরোধী আন্দোলনের পর এখন আবার ‘কোটা’র সুবিধাই দেওয়া হচ্ছে আন্দোলনকারীদের পরিবারকে।

এর আগে, স্কুল পর্যায়ে জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের পরিবারের সন্তানদের সরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তিতে কোটা নির্ধারণ করা হলেও পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে। পরিবর্তে, প্রতি শ্রেণিতে একটি করে অতিরিক্ত আসন রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ মে উপদেষ্টা পরিষদ ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং আহত ছাত্র-জনতার কল্যাণ ও পুনর্বাসন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী, শহীদ ও আহতদের পরিবার কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ, আবাসন সুবিধা, চিকিৎসাসেবা এবং আত্মকর্মসংস্থানের জন্য সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

এ বিষয়ে ফেসবুকে অনেকে মন্তব্য করছেন, ‘যারা কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন, এখন তাদের পরিবারকেই কোটা সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।’ আবার অনেকেই বলছেন, ‘এটি কোটা নয়, বরং একবারের জন্য দেওয়া বিশেষ সুযোগ।’

জিএসটি গুচ্ছভুক্ত ভর্তি পরীক্ষার সমন্বয়ক ও মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল আজীম আখন্দ বলেন, ‘সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যরা এবারের ভর্তি কার্যক্রমে বিশেষ সুবিধা পাবেন। আমরা উপাচার্যদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে প্রজ্ঞাপনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবো।’

সূত্রমতে, চলতি বছরের ২ মার্চ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর সরকারি স্কুল ও কলেজের প্রধান শিক্ষকদের চিঠি দিয়ে ভর্তিতে কোটা রাখার নির্দেশনা দেয়। তবে সমালোচনার মুখে পরদিনই তা সংশোধন করে প্রতি শ্রেণিতে একটি করে অতিরিক্ত আসন রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতরের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. রফিকুল ইসলামের পাঠানো ২৬ মে’র এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গেজেটভুক্ত শহীদ ও তালিকাভুক্ত আহতদের পরিবারের সদস্যরা ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষ স্নাতক শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষায় বিশেষ সুবিধা পাবেন। স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে অগ্রাধিকার পাবে, তবে না থাকলে ভাই-বোনও এই সুবিধা পাবেন। এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ডিনস কমিটির এক সভায়।

এদিকে, গুচ্ছভুক্ত ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির আবেদন শুরু হয়েছে ২৯ মে। অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়া চলবে ৫ জুন রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত। আবেদনকারীদের প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী বিবেচনা করা হবে। সাধারণ আবেদন ফি ৫০০ টাকা এবং বিশেষায়িত বিষয় (চারুকলা, নাট্যকলা, ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া, শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়াবিজ্ঞান) পছন্দক্রমে অন্তর্ভুক্ত থাকলে অতিরিক্ত ৩০০ টাকা ফি দিতে হবে।

কোটা অপশন ও বিশেষ সুবিধা

ভর্তির অনলাইন আবেদন ফর্মে কোটা অপশনে ‘মুক্তিযোদ্ধা’, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা উপজাতি’, ‘পোষ্য কোটা’, ‘বিকেএসপি বা খেলোয়াড়’, ‘হরিজন ও দলিত’ এবং ‘নন-ট্রাইবাল (পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থায়ী বাসিন্দা)’—এসব কোটা উল্লেখ থাকলেও জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট সুবিধাটি ‘বিশেষ সুবিধা’ হিসেবে আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে।

নির্দেশিকার শেষাংশে বলা হয়, গেজেটভুক্ত শহীদ ও তালিকাভুক্ত আহতদের স্ত্রী-সন্তান এবং তাদের অবর্তমানে ভাই-বোন ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষে গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির ক্ষেত্রে এককালীন বিশেষ সুবিধা পাবেন।