সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক গণিতের প্রধান পরীক্ষক

লেখাপড়া করেছেন অর্থনীতি বিষয় নিয়ে। শিক্ষক হিসেবে এমপিওভুক্ত হয়েছেন সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে। আর শিক্ষার্থীদের পাঠদান করান গণিত বিষয়ে। রাজধানী ঢাকার খিলক্ষেত এলাকার কুর্মিটোলা হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের এমপিওভুক্ত ওই শিক্ষক আলতাব হোসেন এখন গণিতের প্রধান পরীক্ষক। বিষয়টি নিয়ে বিব্রত গণিত বিষয়ের পরীক্ষরা। সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের এমপিওভুক্ত শিক্ষক প্রধান পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ায় এ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে সম্প্রতি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কুর্মিটোলা হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের এমপিওভুক্ত শিক্ষক আলতাব হোসেন দীর্ঘদিন ধরেই গণিতের পরীক্ষক। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র নিয়ে প্রতিষ্ঠানে গিয়ে গণিতের প্রধান পরীক্ষক হিসেবে পরিচয় দেন। এতে গণিতের মূল শিক্ষকরা বিব্রত বোধ করেন।

অভিযোগে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানপ্রধানের সহায়তা নিয়ে তিনি প্রধান পরীক্ষক হন। শিক্ষা বোর্ডের নির্ধারিত ফরম ই-টিআইএফ ফরমে গণিতের শিক্ষক হিসেবে তথ্য দেন। এই তথ্য যাচাই করার দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানপ্রধানের। কারণ কে কোন বিষয়ের শিক্ষক তা জানেন প্রতিষ্ঠানপ্রধান। তাই তথ্য যাচাই করে বোর্ডে পাঠানোর দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানপ্রধানের।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একজন সাবেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যদি এমন ঘটনা ঘটে তাহলে সেটি তথ্যদাতা হিসেবে পরীক্ষক এবং পরীক্ষক হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানপ্রধানের অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক গণিতের পরীক্ষকই তো হতে পারেন না, পরীক্ষক হলে দীর্ঘদিন পর তাকে প্রধান পরীক্ষক করা হয়।’

সমাজবিজ্ঞানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক হয়ে কীভাবে গণিতের প্রধান পরীক্ষক হলেন জানতে চাইলে কুর্মিটোলা হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের স্কুল শাখার সহকারী শিক্ষক আলতাব হোসেন নিজেকে গণিতের শিক্ষক হিসেবে পরিচয় দেন। বলেন, ‘এখানে আমার ৩৩ বছরের শিক্ষকতা। ১৯৯৮ সাল থেকে খাতা দেখি। আমাদের সময় এসব (সাবজেক্ট নির্ধারণ) কোনও বিষয় ছিল না। ১৯৯৪ সালে এমপিওভুক্ত। তখন সাবজেক্টের নাম ছিল না। পরে আমাদের সমন্বয় করা হয়েছে। আগেও যারা গণিতের শিক্ষক ছিলেন তাদের গণিতের নাম লেখা নেই।’

কোন বিষয়ে লেখাপড়া করে সনদ নিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ম্যাথ, পরিসংখ্যান ও অর্থনীতি।’ অনার্সে কী সাবজেক্ট ছিল, জানতে চাইলে প্রথমে ‘ম্যাথ, পরিসংখ্যান ও অর্থনীতি’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে অনার্সে আপনার সাবজেক্টের নাম কী ছিল তা সুনির্দিষ্ট করে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অর্থনীতি।’

সমাজবিজ্ঞানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক কীভাবে গণিতের প্রধান পরীক্ষক হলেন, জানতে চাইলে কুর্মিটোলা হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. শাহজাহান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি কী করে বলবো, তাকে জিজ্ঞাসা করেন।’

বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে যাচাই করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি আরও ১০-১৫ বছর আগের তথ্য। যখন পরীক্ষক হন তখন যিনি বা যারা তথ্য দেন, সেই আলোকেই তিনি পরীক্ষক হয়ে আসছেন। এটি নতুন কোনও ঘটনা নয়।’

এই বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের যে প্রগ্রামিংটা করা হয়ে থাকে তা অধ্যক্ষ বা প্রধান শিক্ষকের হাতে থাকে। প্রতিষ্ঠানপ্রধান ঠিক করে দেন কে পরীক্ষক হবেন। এটা যদি হয়ে থাকে, সে জন্য শিক্ষা বোর্ড দায়ী নয়।’

পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক আরও বলেন, ‘যদি কেউ এমন অনিয়ম করে থাকেন তাহলে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নেবো।’

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একটি সূত্র জানায়, গণিতের পরীক্ষক প্রায় ৯০০ জন। এর মধ্যে প্রধান পরীক্ষক ১৩৯ জন। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষা উত্তরপত্র মূল্যায়নে দায়িত্বহীনতার কারণে ৭১ জন পরীক্ষককে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। চার জন শিক্ষককে পরীক্ষার সব কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।