দেশে নতুন করে শিক্ষা আইন প্রণয়নের উদ্যোগের অংশ হিসেবে খসড়া প্রকাশ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি নিজেদের ওয়েবসাইটে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ আইনের খসড়াটি প্রকাশ করা হয়। প্রকাশিত খসড়ায় কোচিং সেন্টার স্থাপন ও সহায়ক বই (নোট-গাইড) প্রকাশ করার সুযোগ থাকছে তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত। প্রাইভেট টিউশন কার্যক্রমও থাকছে আপাতত। বিধিমালা না হওয়া পর্যন্ত এসব কার্যক্রম বন্ধ করা যাবে না বলে ওই খসড়ায় জানানো হয়েছে। এছাড়া খসড়ায় এনজিও পরিচালিত স্কুলগুলোকে শিক্ষার মূল ধারায় আনা ও কওমি শিক্ষার মানোন্নয়নের বিধান রাখা হয়েছে।
বিগত এক দশকের বেশি সময় ধরে চলমান শিক্ষা আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকার শিক্ষা আইনের খসড়া চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেলেও তারা তা প্রকাশ করতে পারেনি। এর আগেই তাদের পতন হয়। আর বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রায় দেড় বছরের মাথায় শিক্ষা আইনের খসড়া প্রকাশ করা হলো।
গত ১ ফেব্রুয়ারি ওয়েবসাইটে খসড়াটি প্রকাশ করে আগামী ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে মধ্যে মতামত পাঠাতে বলা হয়।
বিগত বছরগুলোতে কোচিং সেন্টার, কোচিং ও গাইড প্রকাশ বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছিলেন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অংশীজন। তবে, সম্প্রতি প্রকাশিত খসড়ায় কোচিং সেন্টার ও গাইড প্রকাশ করা বন্ধ করেনি অন্তর্বর্তী সরকার।
মূল ধারায় যাবে এনজিও স্কুল
দেশে বর্তমানে প্রচুর এনজিওভিত্তিক স্কুল রয়েছে। এসব স্কুলকে শিক্ষার মূল ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে খসড়ায় জানানো হয়। খসড়া আইন হিসেবে প্রবর্তন হলে সরকার বিধিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে স্কুলগুলোকে মূল্যায়ন ও সনদ দেওয়ার জন্য সন্নিবেশ করবে।
প্রাথমিক স্তর হবে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত
প্রাথমিক স্তর পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত থাকবে বলে শিক্ষা আইনের খসড়ায় জানানো হয়েছে। খসড়া অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাক-প্রাথমিক স্তর থাকতে হবে। তবে সরকার, সময়, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষার শ্রেণিস্তর নির্ধারণ বা পুনর্নির্ধারণ করতে পারবে।
প্রসঙ্গত, বিগত সময়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা করার উদ্যোগ নেয় তৎকালীন সরকার। এরই অংশ হিসেবে দেশের ৬৯৬ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত চালু করা হয়। তবে, চলতি বছর থেকে এসব প্রতিষ্ঠানে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত চালু রাখা হয়নি।
খসড়ায় ‘প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক শিশুর শিক্ষার অধিকার’ শিরোনামে বলা হয়, সব শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক হবে। শিক্ষা শিশুর অধিকার হিসেবে গণ্য হবে। সরকার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে যথাসম্ভব স্ব স্ব মাতৃভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা চালু করবে। সরকার সকল ধরনের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুকে শিক্ষাদানের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে।
মাধ্যমিক শিক্ষা ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা স্তর
খসড়ায় বলা হয়, মাধ্যমিক শিক্ষার স্তর নির্ধারণ ও পুনর্নির্ধারণ করতে পারবে সরকার। নির্ধারণ বা পুনর্নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত মাধ্যমিক শিক্ষার স্তর হবে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত। একাদশ শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত উচ্চ মাধ্যমিক স্তর। খসড়া অনুযায়ী, মাধ্যমিক শিক্ষা ধারা হচ্ছে—সাধারণ শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা।
শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি
খসড়ায় বলা হয়, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের মাধ্যমে নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত শ্রেণি এবং বিষয়ভিত্তিক পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করবে সরকার। প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সকল ধারায় সরকার কর্তৃক নির্ধারিত জাতীয় শিক্ষাক্রম বাধ্যতামূলক হবে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের শিখন চাহিদা অনুসারে মাতৃভাষা শিক্ষা পাঠ্যপুস্তক যুক্ত করা যাবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ধরনের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি থাকবে।
বিদেশি শিক্ষাক্রমের আওতায় পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাক্রমে সরকার নির্ধারিত বিষয়গুলো বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এ বিষয়ে সরকার পৃথক বিধিমালা প্রণয়ন করবে। এই বিধানের কোনও প্রকার ব্যতিক্রম বা ব্যত্যয় করা হলে সরকার সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিল করতে পারবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব (নিরীক্ষা ও আইন অনুবিভাগ) জহিরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটি একটি প্রাথমিক খসড়া। অনেক কাজ রয়েছে খসড়া নিয়ে। ইতোমধ্যে ৬০০ এর বেশি মতামত পাওয়া গেছে। মতামত যাচাই-বাছাই করে খসড়া চূড়ান্ত হবে। মতামত নিয়ে সভা আয়োজন করা হতে পারে।
প্রাথমিক স্তরের অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাদ দিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত করা হয়েছে এ বিষয়ে জহিরুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক খসড়া মতামতের ভিত্তিতে আলোচনা করে চূড়ান্ত হবে। এটি এখনই চূড়ান্ত নয়।
খসড়ায় কোচিং সেন্টার নোট-গাইড, প্রাইভেট টিউশন আপাতত বলবৎ রাখা হয়েছে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে জহিরুল ইসলাম বলেন, মতামতের ভিত্তিতে খসড়া চূড়ান্ত করা হবে।