শিক্ষক নেতাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করে একজন প্রধান শিক্ষকসহ মোট চার শিক্ষক নেতাকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সহকারী শিক্ষকদের দশম গ্রেডের দাবিতে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া এই চার শিক্ষক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। তবে বর্তমানে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে এবং শাস্তিমূলক বদলিও বহাল রাখা হয়েছে।
সাধারণ শিক্ষকদের অভিযোগ, বেতন গ্রেড পরিবর্তনের দাবির চেয়ে কে বড় নেতা হবেন এবং কে সরকারের কাছাকাছি যেতে পারবেন; সেই প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত কয়েকজন শিক্ষক নেতা। এ কারণে তারা ‘ট্যাগিং’ কৌশল প্রয়োগ করছেন। এতে সাধারণ শিক্ষকরা উপেক্ষিত ও বঞ্চিত হবেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছর দশম গ্রেডসহ তিন দফা দাবি আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া চার শিক্ষক নেতাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ৪২ জন সহকারী শিক্ষক এবং একজন প্রধান শিক্ষককে বদলি করা হয়েছিল। একই সময়ে নোয়াখালী জেলার সব সহকারী শিক্ষক ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
এই চার শিক্ষক নেতা হলেন, বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির (কাসেম-শাহীন) সভাপতি মো. আবুল কাসেম, বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. শামছুদ্দিন মাসুদ, বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির (শাহিন-লিপি) সাধারণ সম্পাদক খায়রুন নাহার লিপি এবং প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের নেতা মু. মাহবুবুর রহমান।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রধান শিক্ষক মো. আবুল কাসেমকে ময়মনসিংহ জেলার ফুলপুর উপজেলার চাঁনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বরিশাল সদরের চরবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়। সহকারী শিক্ষক খায়রুন নাহার লিপিকে মোহাম্মদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে মানিকগঞ্জ সদরের গোলাম মনির হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, মো. শামছুদ্দিন মাসুদকে নোয়াখালী সদর উপজেলার কৃপালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার দক্ষিণ চরলক্ষ্মী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং মু. মাহবুবুর রহমানকে জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলাল উপজেলার হিন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে নওগাঁ জেলার রানীনগর উপজেলার ভাটকই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়।
মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষক বদলি নীতিমালায় নিজ জেলা বা উপজেলায় বদলিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কয়েকজন শিক্ষক নেতাসহ ৪৩ জন শিক্ষককে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় বদলি করা হয়।
বদলি হওয়া ৪৩ জনের মধ্যে চার শিক্ষক নেতা ছাড়া অন্য সবার শাস্তিমূলক বদলি বর্তমান সরকার প্রত্যাহার করেছে। তবে এই চার শিক্ষক নেতার বদলির আদেশ এখনও বহাল রয়েছে।
শিক্ষকদের দাবি, এই চারজনকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে। তারা আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। অন্যদিকে, যেসব নেতা শিক্ষকদের দাবি আদায়ে সক্রিয় ছিলেন না, তারা বর্তমানে সরকারের পছন্দের ব্যক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে এই চার নেতাকে ‘লীগের লোক’ আখ্যা দিয়ে মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরে অভিযোগ করেছেন। ফলে তাদের বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির (কাসেম-শাহীন) সভাপতি মো. আবুল কাসেম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বর্তমানে দু-একজন শিক্ষক নেতার মধ্যে নতুন একটি প্রবণতা লক্ষ্য করছি। নিজেদের বর্তমান সরকারের লোক প্রমাণ করতে তারা মরিয়া। সে কারণে শিক্ষক নেতাদের মধ্যে বিভক্তি দেখিয়ে মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরে অসত্য অভিযোগ করা হয়েছে। এ কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় করা ৩৮ জন শিক্ষকের শাস্তিমূলক বদলি প্রত্যাহার করা হলেও চারজন শিক্ষককে এখনও প্রত্যাহার করা হয়নি। তাতে কোনও সমস্যা নেই। শিক্ষকদের ন্যায্য দাবির বাইরে আমরা কোনও কাজ করিনি। সরকারি নিয়মের মধ্যেই আন্দোলন করেছিলাম। দু-তিনজন নেতা, যারা পিছিয়ে পড়েছিলেন, তারা এখন ভালো সাজতে চার শিক্ষককে ফাঁসানোর প্রক্রিয়া হাতে নিয়েছেন এবং বিভিন্নভাবে অসত্য তথ্য দিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।’
কোন শিক্ষক নেতারা নিজেদের সরকারের লোক প্রমাণে ব্যস্ত, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সব শিক্ষকই তা জানেন। আপনারাও জানেন। আমি কারও নাম বলে কাউকে বিব্রত করতে চাই না।’
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির (শাহিন-লিপি) সাধারণ সম্পাদক খায়রুন নাহার লিপি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিনের শিক্ষকদের বঞ্চনা থেকে পরিত্রাণের জন্য গত আগস্টের পর অধ্যাপক ড. ইউনূস সরকার যখন প্রাথমিক শিক্ষা সংস্কার কমিটি গঠন করে, তখন থেকেই শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের দাবিগুলো সরকারের কাছে উপস্থাপন করে যাচ্ছিলাম। মূলত মিথ্যা আশ্বাসের কারণে শিক্ষকদের রাজপথে নামতে বাধ্য করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে আমরা কর্মসূচি প্রত্যাহার করি। কিন্তু আজও সেই তিন দফা দাবি বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। সহকারী শিক্ষকদের ১১টি সংগঠন এবং আমাদের দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করলেও শাস্তি দেওয়া হলো শুধু আমাদের চারজনকে।’
তিনি বলেন, ‘ঐক্যের নামে ১১টি সংগঠন পরীক্ষা বন্ধ ও শাটডাউন কর্মসূচি আগে ঘোষণা করেছিল। আমরা বৃহত্তর স্বার্থে তাদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে দাবি আদায়ের জন্য কাজ করেছি। কিন্তু এটি যে তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা বিধান পোদ্দারের মাধ্যমে ঐক্য পরিষদের নেতাদের সাজানো ফাঁদ ছিল, তার প্রমাণ শাস্তির ক্ষেত্রেও বৈষম্য। পোদ্দার স্যারের এক বক্তব্যে আমাদের চারজন শিক্ষক নেতাসহ সাধারণ শিক্ষকদের ভুঁইফোড় বলা হয়েছিল। পরে আন্দোলনের নামে ৪৩ জন শিক্ষককে জেলা ও বিভাগের বাইরে বদলি করা হয়। অথচ যাদের আহ্বানে সাধারণ শিক্ষকরা মাঠে নেমেছিলেন, তাদের সঙ্গে এমন আচরণ সত্যিই দুঃখজনক।’
খায়রুন নাহার লিপি আরও বলেন, ‘আমি এখন কোনও শিক্ষকের শাস্তি চাই না। তবে সত্য তথ্য মিডিয়া, সাধারণ মানুষ এবং বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে পৌঁছানো জরুরি বলে মনে করি। বর্তমান সরকারের সহযোগিতায় আমাদের ৩৮ জন শিক্ষক আগের জেলায় ফিরতে পেরেছেন, এজন্য ধন্যবাদ জানাই। তবে তাদের মধ্যেও বৈষম্য রয়েছে, কারণ সবাই আগের বিদ্যালয়ে পদায়ন পাননি। আমি বর্তমান সরকারের কাছে আর্জি জানাচ্ছি, প্রকৃত সত্য যাচাই করে বিগত সরকারের সময়ে শিক্ষকদের ওপর হওয়া অত্যাচার, জুলুম, বিভাগীয় মামলা এবং বদলির বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করা হোক।’
বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. শামছুদ্দিন মাসুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিভিন্ন জেলার ৪২ জন সহকারী শিক্ষককে বদলি করা হয়েছে। নোয়াখালী জেলার সব শিক্ষক এবং দেশের বিভিন্ন এলাকার আরও কিছু শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। অন্য একটি আদেশে বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির (কাসেম-শাহীন) সভাপতি প্রধান শিক্ষক মো. আবুল কাসেমকে ময়মনসিংহ থেকে বরিশালে বদলি করা হয়। বর্তমান সরকারকে ধন্যবাদ, তারা প্রায় সব শিক্ষককে হয়রানি থেকে রক্ষা করেছে। আমরা চারজন এখনও বদলিকৃত কর্মস্থলে আছি, তা নিয়ে কোনও সমস্যা নেই। তবে কষ্ট লাগে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া আদায়ে কাজ করলেও বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের ভিলেন বানানো হচ্ছে। মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর নিশ্চয়ই বিষয়টি যাচাই করে ব্যবস্থা নেবে। কে কত বড় নেতা হবে, সেই প্রতিযোগিতায় অন্য শিক্ষককে বিপদে ফেলার ঘটনা কারও ক্ষেত্রে না ঘটুক— এটাই প্রত্যাশা।’
প্রসঙ্গত, দশম গ্রেড বাস্তবায়নসহ তিন দফা দাবিতে গত বছরের ৮ নভেম্বর থেকে অবস্থান কর্মসূচি এবং ৯ নভেম্বর পর্যন্ত কর্মবিরতিসহ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষকরা। পরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ১১তম গ্রেড নির্ধারণের আশ্বাস পেয়ে তারা আন্দোলন প্রত্যাহার করেন। পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষকদের দশম গ্রেড দেওয়া হলে সহকারী শিক্ষকরা ১১তম গ্রেডের দাবি তোলেন।
নভেম্বরের মধ্যে ১১তম গ্রেড বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনও অগ্রগতি না হওয়ায় শিক্ষকরা গত বছর ৩০ নভেম্বর থেকে কর্মবিরতি শুরু করেন। ১ ডিসেম্বর থেকে তৃতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন বর্জন করা হয়। ৩ ডিসেম্বর দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ঘোষণা করা হলেও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়।
চেষ্টা করেও এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফেতরের মহাপরিচালকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।