সব বোর্ডে এক প্রশ্ন, বৈষম্য বাড়বে নাকি সমতা?

দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে দীর্ঘদিন ধরে ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নপত্রে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও উচ্চ-মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। তবে এবার সেই ব্যবস্থা থেকে সরে এসে সব সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে শুরু হয়েছে আলোচনা। কেউ বলছেন, এটি শিক্ষার্থীদের সমান মানদণ্ডে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করবে। আবার কেউ আশঙ্কা করছেন, এতে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা আরও প্রতিযোগিতার চাপে পড়বে।

আগামী ২ জুলাই থেকে শুরু হয়ে ৮ আগস্ট পর্যন্ত চলবে এ বছরের এইচএসসির লিখিত পরীক্ষা। এরপর ১৫ আগস্টের মধ্যে ব্যবহারিক পরীক্ষা শেষ হবে।

সম্প্রতি শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, এবার সারা দেশে একক প্রশ্নপত্রে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও বর্তমান সচিব অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এবার একই প্রশ্নপত্রে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। সব বোর্ডের প্রশ্ন হবে অভিন্ন।

শিক্ষামন্ত্রী গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, একেক বোর্ডের সঙ্গে একেক বোর্ডের প্রতিযোগিতা থাকে। কেউ বলে কোনও বোর্ড সহজ প্রশ্ন করে, কেউ বলে কঠিন প্রশ্ন করে। কিন্তু একই দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য ভিন্ন প্রশ্নপত্র হওয়া যৌক্তিক নয়।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ও-লেভেল বা এ-লেভেলের মতো পরীক্ষাতেও একই পরীক্ষার জন্য ভিন্ন প্রশ্নপত্র হয় না। সেই বিবেচনা থেকেই অভিন্ন প্রশ্নপত্রের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে।

শিক্ষাবিদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা তো একসময় অভিন্ন প্রশ্নপত্রেই পরীক্ষা দিয়েছি। পরে প্রশ্নফাঁস ও নকলের কারণে বোর্ডভিত্তিক প্রশ্নপত্র চালু হয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীরা আরও যত্ন নিয়ে প্রস্তুতি নেবে।

তিনি বলেন, এর মাধ্যমে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের প্রকৃত অবস্থান বোঝা যাবে। কোথায় কী ধরনের বৈষম্য আছে, সেটাও চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। যদি দেখা যায় কোনও অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে, তাহলে সে অনুযায়ী পরিকল্পনা নেওয়া যাবে।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, দেশের সব অঞ্চলের শিক্ষার মান সমান না থাকায় এখনই অভিন্ন প্রশ্নপত্র চালু করা কতটা যৌক্তিক।

তাদের যুক্তি, শহর ও গ্রামাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, শিক্ষকের দক্ষতা এবং শিক্ষার সুযোগ-সুবিধার মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। ফলে একই প্রশ্নপত্রে মূল্যায়ন করলে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে অসুবিধায় পড়তে পারে।

শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সব বোর্ডে একই প্রশ্নপত্র হলে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের একটি অভিন্ন মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা যাবে। এটি নীতিগতভাবে ভালো উদ্যোগ।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশের সব অঞ্চলের আর্থসামাজিক অবস্থা এক নয়। সব জায়গার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মানও সমান নয়। ইনপুট ও শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় বৈষম্য রেখে শুধু মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সমতা আনা হলে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

তার ভাষ্য, প্রথমে শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরের বৈষম্য কমিয়ে আনা দরকার। তারপর অভিন্ন প্রশ্নপত্র পুরোপুরি কার্যকর করা হলে এর সুফল বেশি পাওয়া যাবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি ভালো উদ্যোগ হতে পারে, তবে এখনই আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত কিনা, সেটি বিবেচনা করা প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, প্রশ্নফাঁস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডে আলাদা প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে অভিন্ন প্রশ্নপত্রেই এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতো।