সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য (ভিসি) পরিবর্তনের ঘটনাও যেন এক অলিখিত রীতিতে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন সরকারের আমলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে নিয়োগকে ঘিরে রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এবং বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পরও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে উপাচার্য নিয়োগের পর সেই বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে।
এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে—একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ একাডেমিক ও প্রশাসনিক পদে নিয়োগের মানদণ্ড কী হওয়া উচিত? বিদ্যমান আইন কী বলে? আর বাস্তবে কীভাবে হচ্ছে এই নিয়োগ?
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যা ঘটেছিল
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের পতনের পর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের মুখে একের পর এক উপাচার্য পদত্যাগ করেন। সে সময় ‘মবের চাপে’ উপাচার্যদের পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে—এমন অভিযোগও ওঠে, যা ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কমপক্ষে ৩০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদত্যাগ করেন। পরে রাষ্ট্রপতি একযোগে ১৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন। ধাপে ধাপে আরও পদত্যাগ হওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মোট ৪৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া বেশ কয়েকজন উপাচার্য পদত্যাগ করেন বা তাদের অব্যাহতি গ্রহণ করা হয়। এরপর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে উপাচার্য পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে।
আইনে যা আছে
বাংলাদেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে রাষ্ট্রপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে, উপাচার্য নিয়োগ দেন। তবে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় না।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইনে সিনেটের মনোনীত তিন সদস্যের প্যানেল থেকে আচার্য উপাচার্য নিয়োগ দেন। অন্যদিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে আচার্য সরাসরি উপাচার্য নিয়োগের ক্ষমতা রাখেন। ফলে দেশে উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিন্ন আইন বা একক নীতিমালা নেই।
সার্চ কমিটির দাবি
বাংলাদেশে উপাচার্য নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠনের দাবি দীর্ঘদিনের। ১৯৯১ সালের টাস্কফোর্স, ২০০৩ সালের শিক্ষা কমিশন এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কৌশলগত পরিকল্পনাতেও সার্চ কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছিল।
এসব সুপারিশে বলা হয়, বর্তমান ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ থেকে যায় এবং যোগ্য ব্যক্তিকে বাছাইয়ের প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
বিদেশে যেভাবে নিয়োগ হয়
বিশ্বের অনেক দেশে উপাচার্য নিয়োগে উন্মুক্তভাবে আবেদন আহ্বান করা হয়। পরে যোগ্য প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত মূল্যায়ন, সাক্ষাৎকার, উপস্থাপনা এবং স্বাধীন সার্চ বা সিলেকশন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে চূড়ান্ত নিয়োগ দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক, সিনেট, বোর্ড অব ট্রাস্টিজ বা বিশ্ববিদ্যালয় কাউন্সিলও এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়।
বাংলাদেশে বিতর্ক
বাংলাদেশে উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন সরকারের সমর্থক শিক্ষক, শিক্ষক সংগঠনের নেতা কিংবা রাজনৈতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিদের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে সরকারগুলো বরাবরই দাবি করে এসেছে, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার ভিত্তিতেই এসব নিয়োগ দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধূরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের এই প্রবণতা আমরা প্রায় সব সরকারের সময়ই দেখেছি। কেউই এর বাইরে যেতে পারেনি। কেন পারেনি, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বর্তমান সরকার দল-মতের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও থাকা উচিত।”
তিনি বলেন, “অনেক সময় এমন ব্যক্তিরা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন, যাদের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একদিকে আমরা যদি মানসম্মত শিক্ষা চাই, অন্যদিকে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ না দিই, তাহলে সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।”
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
রাশেদা কে চৌধূরীর মতে, রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে একাডেমিক নেতৃত্ব, গবেষণা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার ভিত্তিতে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, গবেষণার পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা আরও শক্তিশালী হবে।
তার মতে, একটি স্বাধীন সার্চ কমিটি গঠন করে সেখানে দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাবেক উপাচার্য, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক, ইউজিসির প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। পাশাপাশি যোগ্যতার মানদণ্ড প্রকাশ, উন্মুক্ত আবেদন আহ্বান এবং সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশের মতো পদক্ষেপ নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করতে পারে।
উপাচার্যের যোগ্যতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “একজন উপাচার্যের মধ্যে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও প্রকাশনার স্বীকৃত রেকর্ড, অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘ একাডেমিক অভিজ্ঞতা, বিভাগ, অনুষদ বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনা পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা, আর্থিক ও প্রশাসনিক সুশাসন নিশ্চিত করার সক্ষমতা, ব্যক্তিগত সততা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও গবেষণা তহবিল আহরণের সক্ষমতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্বাধীনতা রক্ষার মানসিকতা থাকা উচিত। এসব যোগ্যতা মূল্যায়নের জন্য একটি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ ব্যবস্থা অপরিহার্য।”
শিক্ষকদের পর্যবেক্ষণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কেন্দ্রীয় কমিটির শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক হিসেবে দীর্ঘ সময় নেতৃত্ব দিয়েছেন। এছাড়া তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সংগঠন ‘ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (ইউট্যাব)-এর সভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন।
এছাড়া বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়ার চেয়ে আরও খারাপ নজির তৈরি হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মবের মুখে উপাচার্যকে বিদায় করতে বাধ্য করার ঘটনায়। তাদের ভাষ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রায় সব উপাচার্যকে অব্যাহতি নিতে বাধ্য করা হয়েছিল। বর্তমান সরকারের সময়ে মবের ঘটনা না ঘটলেও অব্যাহতি নিতে বাধ্য করার অভিযোগ শোনা গেছে। রাতারাতি অব্যাহতির পর নতুন করে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম স্থগিত) সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ হওয়া দোষের নয়। তবে যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হলো কি না, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। তাছাড়া নিয়োগ পাওয়ার পর দলীয় লেজুড়বৃত্তি করা উচিত নয়। দলীয় অনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ দেখা হচ্ছে কি না, সেটিই বিবেচ্য।”
ইউজিসির বক্তব্য
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “বর্তমান সরকারের সময়ে উপাচার্য নিয়োগে ‘দলীয় বিবেচনা’ হয়েছে—এমন অভিযোগ আইনগতভাবে প্রমাণ করা সহজ নয়।” তাঁর দাবি, সরকারের লক্ষ্য ছিল সবচেয়ে যোগ্য শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া। তবে ‘যোগ্য’ বিষয়টি আপেক্ষিক বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, “পরিবর্তিত বাস্তবতায় যারা অতীতের কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ নেই। সেক্ষেত্রে যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তারা যোগ্য শিক্ষক। কেউ এটিকে রাজনৈতিক বিবেচনা বলবেন কি না, সেটি দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়। তবে আমার বিশ্বাস, নিয়োগ পাওয়া প্রত্যেকেই যোগ্য উপাচার্য।”
ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, “আমি অল্প সময় ধরে ইউজিসিতে দায়িত্ব পালন করছি। এরই মধ্যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করেছি। আমার অভিজ্ঞতায়, নতুন উপাচার্যরা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন এবং সরকার যে জ্ঞান ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার রূপান্তরের কথা বলছে, সেটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিচ্ছেন।”
তার ভাষ্য, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হলো বৈষম্যহীন, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে শিক্ষার্থীরা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় সক্ষম হয়। তিনি বলেন, “স্কিল ডেভেলপমেন্ট, কারিকুলাম সংস্কার এবং একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি সংযোগ জোরদারের মাধ্যমে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। যারা এই রূপান্তরকে নেতৃত্ব দিতে পারবেন, তাদেরই উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে আমি মনে করি।”
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মবের মুখে উপাচার্যদের পদত্যাগ এবং পরবর্তী সময়ে নতুন করে ভিসি নিয়োগের ফলে রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগ উঠেছে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসির এই সদস্য বলেন, “সরকার তার নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে সক্ষম নেতৃত্ব চায়, সেটি স্বাভাবিক। তবে সেই সঙ্গে অবশ্যই যোগ্যতা, সততা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। আমার বিশ্বাস, বর্তমান নিয়োগগুলোতে সেই বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।”
ইউজিসির ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে আইনে যেটুকু দায়িত্ব ইউজিসির রয়েছে, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আমরা সেই ভূমিকা পালনের চেষ্টা করেছি। ভবিষ্যতেও আইন অনুযায়ী সেই দায়িত্ব পালন করা হবে।”