এসএসসির ফল ‘বিপর্যয়’, শিক্ষামন্ত্রী বললেন ‘মন খুলে গান গাওয়া যায়, নম্বর দেওয়া যায় না’

চলতি বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে পাসের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে। গত বছর এই হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশীয় পয়েন্ট। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬ জন। ফলাফলের এই অবনমন নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, ‘মন খুলে গান গাওয়া যায়, নম্বর দেওয়া যায় না।’ 

সোমবার (১০ আগস্ট) সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। ফল প্রকাশের আগে সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘এবার পরীক্ষা নিতে দেরি হয়েছে। ২০২৭ সালে আমরা ৭ জানুয়ারি পরীক্ষা নেবো। এভাবে ক্রমান্বয়ে এগিয়ে আনছি।’

তিনি বলেন, অনেক সময় ক্লাস করে ফেলে এবং বোর্ডের ১৯৮০ সালের আইন অনুযায়ী খাতা পরিদর্শন বা নিরীক্ষণের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। বর্তমানে ১৯৮০ সালের পাবলিক পরীক্ষা আইন সংশোধন করা হয়েছে। যেসব ছাত্রছাত্রী খাতা পুনঃপরীক্ষার জন্য আবেদন করবেন, তাদের সম্পূর্ণ খাতা পুনঃপরীক্ষণ করা হবে। কোথাও কোনো ভুল-ত্রুটি হয়ে থাকলে সে বিষয়ে পুনরায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এরপর আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বিস্তারিত ফলাফল তুলে ধরেন।

‘যা নম্বর পেয়েছে, সেটাই দেওয়া হয়েছে’

ফলাফল তুলে ধরার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘মূল প্রসঙ্গ হচ্ছে, ৫ আগস্টের পর থেকেই তো খাতা যে যা নম্বর পাচ্ছে, সেটাই দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তারপরেও এবার কেন... বিষয়টা উত্তর দেওয়ার আমার প্রয়োজন নেই। এবারের পরীক্ষায় যে যা নম্বর পেয়েছে, সেটাই দেওয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, আগে কোনো শিক্ষার্থী পুনঃপরীক্ষা করলে শুধু ট্যাবুলেশন শিট দেখা হতো। ওই শিক্ষার্থীর খাতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে কিনা, তা পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা ছিল না। এবার আইনগতভাবে পরিবর্তন এনে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে তার খাতা পুনঃপরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, ‘সেই ক্ষেত্রে কোনো মানবিক বিষয় নেই। পুনঃনিরীক্ষণে খাতা আবার কাটা হবে। এক্সাক্টলি আবার রিভিউ করা হবে ইনফ্রন্ট অব কমিটি। যদি কেউ কাউকে ভুলভাল মার্কিং করে থাকে বা যেখানে যা পাওয়ার উপযোগ রয়েছে, সেটা যদি না দিয়ে থাকে, রিভিউ কমিটির সামনে সেই খাতা পুনঃপরীক্ষা করা হবে। এক্সাক্টলি প্রত্যেক ছাত্রছাত্রী যা প্রাপ্য, তাকে দিতে হবে।’

‘শূন্য পাসের সংখ্যা তিন-চার গুণ ছিল’

সারা দেশে কোনো কোনো স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় কোনো শিক্ষার্থী পাস না করার বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘সারা দেশে শিক্ষা ব্যবস্থা যদি কোনোভাবে ক্রমসংখ্যায় কমতে থাকে এবং যদি কোনো স্কুলে, কলেজে, মাদ্রাসায় পাস না করে, সেগুলোকে অ্যাড্রেস করা—এই এক্সপেরিয়েন্সটি আমার আছে এবং সেই এক্সপেরিয়েন্সের আলোকেই আমরা কাজ করবো।’

তিনি বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে থাকার সময়ে শূন্য পাসের সংখ্যা এর তিন-চার গুণ ছিল। পরে তা ক্রমান্বয়ে কমে এসেছিল এবং সেসময় নেওয়া ব্যবস্থাগুলো আবার নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, ‘শতভাগ ফেল যেসব প্রতিষ্ঠানে করেছে... আগেই বলেছি, আমার ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত শতভাগ ফেল এর পাঁচ গুণ ছিল। সেই সময় আমরা ব্যবস্থা নিয়ে ক্রমান্বয়ে সেটাকে উন্নত করেছিলাম। এবার জাস্ট অপেক্ষা করুন, ইনশাআল্লাহ। রেজাল্ট তো আজকে আসলো।’

কীভাবে এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটানো যাবে—এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘অনেক পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। শুধু ঢাকলেই কি হবে নাকি? সিরিজ অব সিস্টেম। এটা আমি ইন্ট্রোডিউস করেছিলাম ২০০১ সালে। আমাদের দায়িত্ব হলো, এই শিক্ষা যদি খারাপ হয়ে থাকে, সেটাকে উন্নত করা।’

ভর্তি হবে আগের পদ্ধতিতে

এবারের ফলের ভিত্তিতে ভর্তি পদ্ধতি কী হবে—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, ভর্তি পুরোনো পদ্ধতিতে হবে। অর্থাৎ মার্ক ও জিপিএর ভিত্তিতে ভর্তি হবে।

তিনি বলেন, ‘তাহলে আপনি এবার বুঝতে পারছেন যে সারা বাংলাদেশের মার্ক পেয়ে জিপিএ বেইজড এবং স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড কোয়ালিটি অনুযায়ী স্টুডেন্ট আমরা প্রোভাইড করি সারা দেশে।’

মানবিকে ছাত্রদের ফল সবচেয়ে খারাপ

এবারের ফলাফলে সবচেয়ে বেশি অবনমন দেখা গেছে মানবিক বিভাগে ছেলেদের ফলাফলে। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, মানবিক বিভাগে ছাত্রদের পাসের হার ৪১ দশমিক ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ এ বিভাগে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রতি ১০০ জন ছাত্রের মধ্যে প্রায় ৫৯ জনই পাস করতে পারেনি।

ফলাফলে এমন অবনমনের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের পয়েন্টগুলো (অবজার্ভেশন) দেবেন, ইনশাআল্লাহ আমরা সেগুলো নিয়ে কথা বলবো। আপনি খারাপ বলছেন কেন, কমেছে বলছেন কেন; এটা সুন্দর রেজাল্ট হয়েছে। মন খুলে গান গাওয়া যায়, মন খুলে নম্বর দেওয়া যায় না।’

বিগত সময়ের ফলাফল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি তখন ছিলাম না। আপনি বললেন (বেশি নম্বর) দেওয়া হয়েছিল, জাতি জানলো। আপনার কাছ থেকে জানলাম যে শিক্ষকদের নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, আমি জানতাম না। কেউ না পড়লে তাকে নম্বর পাঠিয়ে দিলে শিক্ষার বিস্তার হয় না।’

মন্ত্রী বলেন, ‘২০০১ সালে দায়িত্ব পেয়েছিলাম, রেজাল্ট ছিল আপ টু ২৮ শতাংশ। আবার যখন আমরা ২০০৬ সালে দায়িত্ব ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম, রেজাল্ট বেড়েছিল আপ টু ৭৭ শতাংশ। যে আমরা রেজাল্ট যে জায়গায় ছিল, সেখান থেকে ক্রমান্বয়ে ওপরের দিকে নিয়ে যাচ্ছি, ইনশাআল্লাহ।’

কারিগরি বোর্ডের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন

কারিগরি বোর্ডের ফলাফলে অসঙ্গতির বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘কারিগরি বোর্ডের কেউ যদি এখানে একটা ভুল তথ্য জানায়—শিক্ষার্থী বলছে ১ লাখ ২০ হাজার, উত্তীর্ণ সংখ্যা বলছে ২৭ হাজার সামথিং, আবার পাসের হার ৫৮ শতাংশ—এখানে একটা বড় সমস্যা হবে। আমাদের এই ধরনের মিস্টেক তো এন্টারটেইন করা যায় না। আমাদের তো এই ক্যালকুলেট নিয়ে ক্যালকুলেশন করবেন। এটা কারেক্ট করে দেন, এক্ষুণি সত্য কোনটা সেটা বলে দেন।’

নম্বর কমবেশির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলায় কম এসেছে। আবার আমি যদি বলি, আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে আমি চারদিকে এবং বোর্ডের রেজাল্ট পর্যালোচনায় লিখেছি—ইংরেজি এবং গণিত। এই দুইটা বিষয় আমরা যখন পরীক্ষা দিয়েছি, তখন থেকে শুরু করে এই দুইটা বিষয়ে ফেলের হার খুব বেশি যায় এবং পাসের হারকে কমিয়ে দেয়।’

ঝরে পড়ার বিষয়ে এক সাংবাদিকের বক্তব্যের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আপনি নিজের পরিসংখ্যান বললেন। আপনি দেখে আসছেন, ঝরে পড়ছে। ইট ইজ এ ট্র্যাডিশন এবং ঝরে পড়ার অনেকগুলো কারণ রয়েছে, যেটা আপনারা বিভিন্ন সময় লিখছেন এবং আমরা কন্টিনিউয়াসলি ইমপ্রুভ করার চেষ্টা করছি। এবং এটা আমাদের জব, এটা আমরা করে যাবোই, হবে ইনশাআল্লাহ।’

পাসের হার কমেছে ৬.২০ শতাংশ

এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ।

এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষার্থী। গত বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। ফলে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬ জন।

পরীক্ষায় নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান জানান, এ ফলাফল অর্জনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ইতিবাচক আন্তঃসম্পর্ক, শিক্ষকদের প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান, অভিভাবকদের ক্রমবর্ধমান সচেতনতা ও সহযোগিতা এবং সুষ্ঠু-শান্তিপূর্ণভাবে পরীক্ষা পরিচালনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এবারের পরীক্ষায় নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সব পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে কেন্দ্রীয়ভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে মনিটরিং করা হয়েছিল। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে কেন্দ্রের প্রবেশদ্বারে পুলিশ সদস্যদের বডি-ওর্ন ক্যামেরা রাখা হয়েছিল।

এই পরীক্ষা যথাসময়ে, পূর্ণ সিলেবাস ও পূর্ণ নম্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানান, প্রধান পরীক্ষক ও পরীক্ষকদের উত্তরপত্র নির্ভুল মূল্যায়নের লক্ষ্যে কর্মশালার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। উত্তরপত্র মানসম্পন্নভাবে মূল্যায়নের লক্ষ্যে পরীক্ষকদের ৩০০টি উত্তরপত্র দেওয়া হয়েছিল।

প্রতিটি কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীদের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পরীক্ষা কেন্দ্রের বাইরে অভিভাবকদের বসার জন্য শেড নির্মাণের নির্দেশনা ছিল। সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

এসএমএসে ফল জানার নতুন পদ্ধতি

শিক্ষামন্ত্রী জানান, এবারই প্রথম পরীক্ষার্থীরা শিক্ষা বোর্ডগুলোর নিজস্ব শর্ট কোড ১৬১৪০-এর মাধ্যমে এসএমএসে ফলাফল জানতে পারবে।

বিশেষভাবে সক্ষম পরীক্ষার্থীদের জন্য ব্যবস্থা

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এবং যাদের হাত নেই, এমন প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থীরা স্ক্রাইব (শ্রুতিলেখক) সঙ্গে নিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। এ ধরনের পরীক্ষার্থী এবং শ্রবণপ্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ৪৫ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছিল।

প্রতিবন্ধী—অটিস্টিক, ডাউন সিনড্রোম ও সেরিব্রাল পালসি পরীক্ষার্থীদেরও অতিরিক্ত ৪৫ মিনিট সময় বাড়ানোসহ শিক্ষক, অভিভাবক বা সহায়তাকারীর বিশেষ সহায়তায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেন, ‘পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এ তথ্যগুলো খুবই ইতিবাচক। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গৃহীত নানামুখী পদক্ষেপ, শিক্ষার্থী-শিক্ষক-অভিভাবকদের অক্লান্ত প্রচেষ্টাসহ সমগ্র শিক্ষা পরিবারের সার্বিক সহযোগিতায় এ অবস্থায় পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। এজন্য আমি শিক্ষা পরিবারের সকলকে জানাচ্ছি অভিনন্দন।’

বিগত বছরগুলোর মতো এবারও সম্পূর্ণ পেপারলেস ফল প্রকাশ করা হচ্ছে। পরীক্ষার্থীদের অনলাইন ও মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে ফল পাওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বোর্ডগুলো, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টায় পরীক্ষার সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ক্রমশ উন্নতির ধারা অব্যাহত রয়েছে।