এবার সেই শিক্ষকের এমপিও ছাড়াতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নামে ‘জাল চিঠি’

জাল-জালিয়াতির অভিযোগে শেরপুরের ঝিনাইগাতি উপজেলার হাজী অছি আমরুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে (বরখাস্ত) মো. জাহাঙ্গীর সেলিমের এমপিও আদেশ স্থগিত হয়েছিল প্রায় ১০ বছর আগে। এরপর মামলা, কারাভোগের নানা ঘটনার পর দীর্ঘদিন ধরেই বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন। সেখানে সুরাহার আগেই সামনে এলো আরেক জালিয়াতির ঘটনা। এবার এমপিও ছাড়াতে খোদ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নামে জাল চিঠির সত্যতা পেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদফতর।

তিনি ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক না হয়েও ওই পদে মো. জাহাঙ্গীর সেলিম এমপিও ছাড় করিয়ে নেন গত ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই তারিখের একটি আদেশে। চিঠিটিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের বেসরকারি মাধ্যমিক-৩ শাখার উপসচিব হিসেবে সোনা মনি চাকমার সই দেখানো হয়েছে। যদিও বর্তমানে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের পরিচালক (যুগ্মসচিব) পদে কর্মরত সোনা মনি চাকমা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘ওই চিঠিটি জাল।’ 

তিনি জানান, ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ছিলেন না। তখন তিনি বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ছিলেন। আর শিক্ষক মন্ত্রণলয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার দায়িত্বে থাকার সময়ও তিনি যুগ্মসচিব ছিলেন শেষ সময় পর্যন্ত।

আর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট জারি শাখায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ ধরনের কোনও চিঠি জারি হয়নি।

জাহাঙ্গীর সেলিম বর্তমানে ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নন। তিনি প্রধান শিক্ষক পদে এমপিও পেয়েছিলেন জাল করা কাগজপত্র দাখিল করে। নিয়োগ ও এমপিও পাওয়ার ক্ষেত্রে জালিয়াতি প্রমাণিত হওয়ার পর তার এমপিও স্থগিত করা হয়।

বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন উম্মে কুলসুম। আদালতের আদেশ থাকার পরও জাহাঙ্গীর সেলিমের জালজালিয়াতির কারণে এই পদের বেতন তুলতে পারছেন না এই শিক্ষিকা। উম্মে কুলসুম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সভাপতির সই জাল করে প্রাধান শিক্ষক পদের জন্য জাহাঙ্গীর সেলিম এমপিও ছাড় করালে তার জালিয়াতি ধরা পড়ে। এমপিও স্থগিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তার নামে জালিয়াতি মামলা করা হয়েছে। কিন্তু সব সরকারের সময় সরকারের লোক সেজে বার বার ছাড় পাচ্ছেন অপরাধ করেও।

সই যার, তিনি বলছেন চিঠি জাল

২০২৪ সালের ৩১ জুলাইয়ের জাল চিঠিতে সোনা মনি চাকমাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের বেসরকারি মাধ্যমিক-৩ শাখার উপসচিব দেখানো হয়েছে। চিঠিতে জাহাঙ্গীর সেলিমের স্থগিত এমপিও ছাড়ার জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদফতরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়।

সোনা মনি চাকমা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি তখন বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে। আমি তখন যুগ্মসচিব। অথচ চিঠিতে লেখা উপসচিব।’

তিনি আরও বলেন, বিষয়টি যাচাই করতে গিয়ে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছেন। মন্ত্রণালয়ের তাকে জানানো হয়েছে এ ধরনের কোনও চিঠি সেখান থেকে জারি হয়নি।

মাউশিও চিঠির সত্যতা যাচাই চেয়েছে

চিঠিটির সত্যতা যাচাই করতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) গত ১ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে চিঠি পাঠায়। এতে ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই চিঠিটির সত্যতা ও সঠিকতা যাচাই করে মতামত দিতে বলা হয়।

চিঠিতে বলা হয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গত ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই ৩৭.০০,০০০০,০৭৪. ০২৯.০০৫.২০২০-২৪১ সংখ্যক স্মারকে জারিকৃত পত্রের আদেশে শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলাধীন হাজী অছি আমরুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জাহাঙ্গীর সেলিমের স্থগিতকৃত এমপিও ছাড়করণের জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হয় (কপি সংযুক্ত)। অধিকতর সতর্কতার জন্য পত্রটি যাচাই এর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

‘এমতাবস্থায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই তারিখের ৩৭.০০.০০০০,০৭৪,০২৯.০০৫.২০২০-২৪১ সংখ্যক স্মারকে জারিকৃত পত্রের সঠিকতা যাচাইপূর্বক মতামত প্রদানের জন্য মহোদয়ের নিকট এতদসঙ্গে সবিনয়ে প্রেরণ করা হলো’, বলেও এতে উল্লেখ করা হয়।

পুরনো জটিলতার সুযোগে নতুন চিঠি

জাহাঙ্গীর সেলিমের প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ ও এমপিও পাওয়া নিয়ে জটিলতা দীর্ঘদিনের। ২০১৩ সালে তার প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগের কাগজপত্রে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতির সইসহ বিভিন্ন নথি জাল করার অভিযোগ ওঠে। পরে তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তার এমপিও স্থগিত করা হয়।

২০১৬ সালের ২১ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয় তার স্থগিত বেতন-ভাতা ছাড়ার নির্দেশ দেয়। ওই আদেশের বিরুদ্ধে উম্মে কুলসুম হাইকোর্টে রিট করেন। পরে বিষয়টি আপিল বিভাগ পর্যন্ত গড়ায়। ২০১৭ সালের ১৩ নভেম্বর আপিল বিভাগে ‘নো অর্ডার’ হয়।

এ নিয়ে ২০১৯ সালে বাংলা ট্রিবিউন প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে বরখাস্ত শিক্ষকের স্থগিত বেতন-ভাতা ছাড়ার উদ্যোগের বিষয়টি উঠে আসে।

২০২২ সালেও জাহাঙ্গীর সেলিমের এমপিও ছাড়ার উদ্যোগ নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে তার এমপিও পুনর্বিবেচনার জন্য কমিটির সভা ডাকার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ওই সময় সোনা মনি চাকমা জানিয়েছিলেন, ‘কমিটির সভা আহ্বান করা মানেই এমপিও দিয়ে দেওয়া নয়, কমিটিই বিষয়টি বিবেচনা করবে।

একই কর্মকর্তার পরিচয় ব্যবহার

মন্ত্রণলয় এবং অধিদফতর সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালের জাল চিঠিতে যে সোনা মনি চাকমার নাম ও সই ব্যবহার করা হয়েছে, তিনি অতীতে অবশ্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওই শাখায় দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে পুরনো একজন কর্মকর্তার নাম, স্বাক্ষর ও তৎকালীন পদবি ব্যবহার করে চিঠিটিকে সরকারি আদেশ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

তবে এই জাল চিঠি কে তৈরি করেছে বা কারা এটি ব্যবহার করেছে, সে বিষয়ে এখনও কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি।

জাল চিঠি বানালো কে?

একজন সরকারি কর্মকর্তার নাম ও সই ব্যবহার করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নামে চিঠি তৈরি করা হয়েছে। সেই চিঠিতে জাহাঙ্গীর সেলিমের স্থগিত এমপিও ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জাহাঙ্গীর সেলিম এমপিও ছাড়ের তদবিরও করছেন। অথচ চিঠিতে যার সইয়ের উল্লেখ আছে, সেই কর্মকর্তা বলছেন, ‘তিনি তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ছিলেন না এবং তার নামে চিঠিটি জাল।’ সংশ্লিষ্ট জারি শাখাও চিঠি জারি করেনি বলে জানা গেছে।

এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, কারা এই চিঠি তৈরি করলো, কীভাবে এটি মন্ত্রণালয়ের চিঠি হিসেবে তৈরি করা হলো এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদফতরে এটি কীভাবে পৌঁছালো?

কীভাবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের কাছ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরে চিঠি পৌঁছালো তা জানতে চাইলে মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শাখা থেকে চিঠি তোলা হয়েছিল। চিঠিটি যাচাই করতে মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠির উত্তর আসলে পরবর্তী নেওয়া হবে।’ 

অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, সন্দেহ হওয়ায় চিঠির সততা যাচাই করতে চিঠি দেন মহাপরিচালক। 

এ বিষয়ে পরিচয় দিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে মো. জাহাঙ্গীর সেলিম ‘নামাজে যাচ্ছি’ বলে ফোন কেটে দেন। পরে মেসেজ দিলেও কোনো জবাব দেননি তিনি।