কোনটা রেখে কোনটা দেখি!

৭০তম কানের উদ্বোধনী মঞ্চকান শহরে পা রাখার প্রথম দু’দিন (১৬ ও ১৭ মে) সূয্যিমামা দিনভর হেসে বেড়ালেও বৃহস্পতিবার (১৮ মে) সকাল থেকে আকাশের মুখ ভার। হাড়কাঁপুনি দেওয়া হাওয়াও বইছিল। তবে তাতে ছন্দপতন ঘটেনি কিঞ্চিৎ। উৎসবে অংশ নিতে কিংবা আশেপাশে থাকতে এদিনও সকাল থেকে মানুষের ভিড়। ছবি তোলা, সেলফি, ভিডিও নিয়ে মাতামাতি আছেই। তবে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখা গেছে ছবি দেখায়।
কানে তরুণ-তরুণী, বুড়োবুড়ি সবার মধ্যে সিনেমাপ্রেম আলাদাভাবে চোখে পড়ে। তা তিনি সাধারণ মানুষই হন আর আমন্ত্রিত সাংবাদিক কিংবা ফিল্ম প্রফেশনালস। তাদের জন্য ছবিরও অভাব নেই। পালে দো ফেস্টিভাল ভবনের গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়ের, সাল দুবুসি, সাল বুনুয়েল, সাল দ্যু সোসানতিয়েমে ছাড়াও আছে ছোট ছোট প্রেক্ষাগৃহ। ভবনের অদূরে এসপেস মিরামার, জেডব্লিউ ম্যারিয়ট, আর্কেডস ওয়ান হোটেলের ছোট আকারের প্রেক্ষাগৃহে দ্বিতীয় দিন প্রদর্শিত হয়েছে বেশকিছু ছবি। এছাড়া শহরজুড়ে বিভিন্ন হোটেল ভাড়া করেও অনেকে ছবি দেখান। এত ছবি, কোনটা রেখে কোনটা দেখি- এই ভাবনায় চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কেটে যায় সারাবেলা!
বৃহস্পতিবারও দিনভর হয়েছে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। প্রতিযোগিতা, প্রতিযোগিতার বাইরে, আনসার্টেন রিগার্ড, কান ক্ল্যাসিকস, সিনেমা ডি লা প্লাজ, স্পেশাল স্ক্রিনিং; কতো না বিভাগ! একেকটিতে হয়েছে একাধিক ছবির প্রদর্শনী। সবই টাটকা! কানের মতো বৈশ্বিক আসরে সব ছবিরই উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়। বাংলা ট্রিবিউন পাঠকদের জন্য থাকলো দ্বিতীয় দিন প্রদর্শিত ছবিগুলোর টুকরো খবর।

‘ওয়ান্ডারস্ট্রাক’ ছবিতে জুলিয়ান মুরপ্রতিযোগিতা বিভাগ
১৮ মে দিনের শুরুতে সকাল সাড়ে ৮টায় (বাংলাদেশ সময় দুপুর সাড়ে ১২টা) গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরে দেখানো হয় টড হেইন্সের ‌‘ওয়ান্ডারস্ট্রাক’। এখানে আসন সীমিত থাকায় যারা দেখতে পারেননি তাদের জন্য একই সময়ে সাল দুবুসিতেও ছিল ছবিটির প্রদর্শনী। সেটাও যারা দেখতে পারেননি, তারা বিকাল ৪টায় গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরে এবং রাত ৮টায় অলিম্পিয়া ওয়ানে দেখানো হয় এটি। বেন ও রোজ নামের দুই বালক-বালিকাকে ঘিরে এর গল্প।
একইভাবে প্রথম দিন প্রদর্শিত আন্দ্রেই জিভিয়াজিন্তসেভের ‘লাভলেস’ দুপুর ১২টা ও সন্ধ্যা ৭টায় গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরে এবং দুপুর ২টায় প্রদর্শিত হয় সাল দ্যু সোসানতিয়েমে প্রেক্ষাগৃহে। এর গল্প বিয়েবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া এক দম্পতিকে ঘিরে। সন্তানসম্ভবা প্রেমিকাকে নিয়ে স্বামী আর দুই শিল্পপতি প্রেমিককে ঘিরে স্ত্রী নতুন জীবন সাজানোর প্রনাকুতি নিয়ে ফেলে। কিন্তু দু'জনের কারও মধ্যে ১২ বছরের পুত্রসন্তানের ভাবনা দেখা যায় না। সে নিখোঁজ হওয়ার পর দম্পতির টনক নড়ে।  
‘বারবারা’ ছবির দৃশ্যআনসার্টেন রিগার্ড
দ্বিতীয় দিন আনসার্টেন রিগার্ড বিভাগের উদ্বোধনী ছবি হিসেবে সাল দুবুসিতে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় প্রদর্শিত হয় ফরাসি পরিচালক ম্যাথু আমারিক পরিচালিত ‘বারবারা’। ব্রিজিট নামের এক অভিনেত্রীকে ঘিরে এর গল্প। সে বারবারা চরিত্রে অভিনয় করবে এমন একটি ছবির শুটিং শুরু হবে শিগগিরই। এজন্য অঙ্গভঙ্গি ও কণ্ঠ নিজের মধ্যে ধারণের পাশাপাশি বারবারার গান ও সুর নিয়ে প্রস্তুতি নিতে থাকে ব্রিজিট। তার ভেতরে চরিত্রটি তৈরি হতে থাকে। একইভাবে ছবিটির পরিচালকও বারবারা চরিত্রটি নিয়ে কাজ করতে থাকেন। একসময় দেখা যায় তাকে প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত করছে ওই নারী। কিন্তু সে ভেবে পায় না কে, বারবারা নাকি ব্রিজিট!
‘ওয়েস্টার্ন’ ছবির দৃশ্যএর আগে সকাল ১০টায় সাল দুবুসিতে ছিল এ বিভাগের ছবি ‘ওয়েস্টার্ন’। জার্মান নারী নির্মাতা ভ্যালেসকা গ্রিজবাচ এ ছবিতে নিজ দেশের একদল নির্মাণ শ্রমিকের গল্প তুলে ধরেছেন। বুলগেরিয়ার এক মফস্বলে দুরূহ কাজ শুরু করেন তারা। তবে ভাষার প্রতিবন্ধকতা ও সংস্কৃতির বৈপরীত্যর সঙ্গে নিজেদের গোঁড়ামি বাধা হয়ে দাঁড়ায় তাদের সামনে। তবে স্থানীয় গ্রামবাসীর সহযোগিতায় পরিচয় ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে ওঠেন শ্রমিকরা। রাত ১০টায় আবার দেখানো হয় ছবিটি।
প্রতিযোগিতার বাইরে
এদিন এ বিভাগে রাত সাড়ে ১০টায় ছিল ‘ব্লেড অব দ্য ইমমর্টাল’। এটি হলো জাপানিজ নির্মাতা মাইক তাকাশির ১০০তম ছবি। এর গল্প দক্ষ সামুরাই মানজিকে ঘিরে। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অমরত্বের অভিশাপ ভর করে তার ওপর। তার বোন খুন হয় নির্মমভাবে। মা-বাবার খুনের বদলা নিতে মরিয়া এক তরুণীর প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় সে। এই যাত্রায় মানজির জীবন এমনভাবে বদলে যায় যে সে তা কল্পনাই করেনি।
‘ব্লেড অব দ্য ইমমর্টাল’ ছবির দৃশ্যউদ্বোধনী দিনের পয়লা ছবি আহনু দেপলেশার “ইসমায়েল’স গোস্টস” যারা মিস করেছেন তাদের জন্য বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় সাল দ্যু সোসানতিয়েমে দেখার সুযোগ ছিল এটি। প্রতিযোগিতা বিভাগের বাইরে নির্বাচিত এই ছবি।
সাল দ্যু সোসানতিয়েমে সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় স্পেশাল স্ক্রিনিং বিভাগে দেখানো হয় বর্ষীয়ান ব্রিটিশ অভিনেত্রী ভ্যানেসা রেডগ্র্যাভ পরিচালিত ‘সি সরো’। এর বাংলা করলে দাঁড়ায় সামুদ্রিক বিষাদ। বিশ্বব্যাপী চলমান শরণার্থী সংকটই ছবিটির বিষয়বস্তু। শরণার্থীদের আর্তনাদ পীড়া দিয়েছে বলে ৮০ বছর বয়সে এসে প্রথমবার পরিচালকের আসনে বসলেন ভ্যানেসা রেডগ্র্যাভ।
‘সি সরো’ ছবির দৃশ্যধ্রুপদী ছবি
উৎসবে দেখানো হচ্ছে ধ্রুপদী কিছু ছবি। কান ক্ল্যাসিকস নামের এ বিভাগের প্রদর্শনী হয় সাল বুনুয়েল প্রেক্ষাগৃহে। রাত ৮টায় ছিল অভিনেত্রী রবিন রাইট পরিচালিত ‘দ্য ডার্ক নাইট’। এর গল্প এক রেস্তোরাঁয় নারী পুলিশ কর্মকর্তা ও গৃহহীন ওয়েট্রেসের মধ্যকার বিতর্ককে ঘিরে। কাহিনিতে আবহ হিসেবে আসে ব্যারি লেভিনসনের প্রথম কাহিনিচিত্র ‘ডাইনার’ (১৯৮২)। রাত সোয়া ৮টায় দেখানো হয় বব ফসেরসংগীতনির্ভর ছবি ‘অল দ্যাট জ্যাজ’ (১৯৮০)।  
‘অল অ্যাবাউট জ্যাজ’ ছবির দৃশ্যবৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় ছিল ভিক্টর ইরিসের ‘ড্রিম অব লাইট’ (১৯৯২)। এক চিত্রশিল্পীর স্বপ্নের গল্প আছে এতে। বিকাল ৪টায় দেখানো হয় শোহেই ইমামুরার ‘ব্যালাড অব নারায়ামা’ (১৯৮৩)। জীবন ও মৃত্যু এবং সন্তান ও মা-বাবার সম্পর্ক এর মূল উপজীব্য। তুষার ঝরার কালে ৭০ বছর বয়সী মাকে পিঠে করে পর্বত পাড়ি দেওয়া ছেলের গল্প আছে এতে।
রাত ১০টায় প্রদর্শিত হয় পিয়েরে শেনালের ‘নেটিভ সান’ (১৯৫১)। এর গল্পে দেখা যায়, শিকাগোর শ্বেতাঙ্গ তরুণী ম্যারি মদ্যপানে ভীষণ আসক্ত। সাধারণত তাকে ঘরে দিয়ে আসে গাড়িচালক বিগার। একদিন দুর্ঘটনায় ম্যারির শ্বাসরোধ করে বসে সে। এরপর লাশ গুম করে পালিয়ে যায়। আরেকটি খুনের পর সে ধরা পড়ে এবং তার মৃত্যুদণ্ড হয়।
‘ব্যালাড অব নারায়ামা’ ছবির দৃশ্যসাগরপাড়ে ছবি
কান উৎসবে প্রতিবার সাগরপাড়ে থাকে ছবির প্রদর্শনী। এ বিভাগের নাম 'সিনেমা ডি লা প্লাজ'। এখানেই কেবল ছবি দেখতে লাগে না কোনও ব্যাজ বা পরিচয়পত্র কিংবা প্রবেশপত্র। সবার জন্য উন্মুক্ত এই বিভাগে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টায় (বাংলাদেশ দেড়টা)  দেখানো হয় পেদ্রো আলমোদোভারের ‘অল অ্যাবাউট মাই মাদার’ (১৯৯৯)।

মজার ব্যাপার হলো, এবারের আয়োজনে প্রতিযোগিতা বিভাগের বিচারকদের সভাপতি পেদ্রো ছোটবেলায় প্রথম ছবি দেখেছিলেন এরকম খোলা আকাশের নিচে।
‘অল অ্যাবাউট মাই মাদার’ ছবির দৃশ্য/জেএইচ/এমএম/