পুতিনের হাতে গৃহবন্দি, লালগালিচায় পরিচালকের নাম

লালগালিচায় কাগজে লেখা কিরিল সেরেব্রেনিকভের নামসবাই জানতো। ‘লেটো’ ছবির উদ্বোধনী প্রদর্শনীর ঠিক আগে এর কলাকুশলীদের মাঝে থাকছেন না রুশ নির্মাতা কিরিল সেরেব্রেনিকভ। সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তাকে গৃহবন্দি করে রেখেছে পুতিন সরকার। বিদেশে যেতে না দিলে কী হবে, থেমে নেই কিরিল। কান চলচ্চিত্র উৎসবের ৭১তম আসরে প্রতিযোগিতা বিভাগে স্বর্ণ পামের লড়াইয়ে ঠিকই জায়গা করে নিয়েছে তার নতুন ছবি।
কিরিলকে ছাড়াই বুধবার (৯ মে) রাত ১০টায় গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরে উদ্বোধনী প্রদর্শনীর কিছুক্ষণ আগে কানের লালগালিচায় হাজির হতে হলো ‘লেটো’র কলাকুশলীদেরকে। তাদের মধ্যে অভিনেত্রী ইরিনা স্তাশেনবাউম হাতে নিয়ে এলেন ‘কিরিল সেরেব্রেনিকভ’ লেখা বড় কাগজ। ক্ষমতার জোরে পুতিন গৃহবন্দি করে রাখতে পারেন, কিন্তু কিরিলের সৃষ্টিকর্ম ঠিকই ছাপিয়ে যায় সীমান্তের বেড়া। শত প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি হাজির হয়ে যেতে পারেন কানের মতো বৈশ্বিক মঞ্চে।
লালগালিচায় কাগজে লেখা কিরিল সেরেব্রেনিকভের নামলালগালিচায় হাঁটার পর পরিচালকের নাম লেখা বড় কাগজটি সহশিল্পীদের হাতে দিয়ে ইরিনা ভালোবাসার চিহ্ন দেখালেন দু’হাতে। শুধু তিনি নন, কিরিলের কাজকে ভালোবাসেন সব চলচ্চিত্রানুরাগী। তাই ‘লেটো’র  কলাকুশলীরা লালগালিচায় পা মাড়িয়ে সিঁড়িতে উঠে দাঁড়ালে  ‘কিরিল সেরেব্রেনিকভ’ লেখা বড় কাগজটি তুলে ধরেন কান উৎসবের পরিচালক থিয়েরি ফ্রেমো। আরেকজন ‘ফ্রি সেরেব্রেনিকভ’ কাগজ হাতে নিয়ে লালগালিচায় হেঁটে সংহতি প্রকাশ করেন।
কিরিলকে কান উৎসবে তার ছবির পক্ষে প্রচারণার জন্য অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে রুশ সরকারের কাছে চিঠি দিয়েছিলেন কানের আয়োজকরা। এক্ষেত্রে তাদেরকে সহযোগিতা করেছে ফ্রান্স সরকারও। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। এ কারণে সশরীরে থাকতে পারলেন না তিনি। তাতে কী, কাগজে তো আছেন!
লেটো’র একটি দৃশ্যএই ‘লেটো’র শুটিং চলাকালেই কিরিলকে গ্রেফতারের পর ২০১৭ সালের আগস্টে মস্কোতে গৃহবন্দি করে রুশ সরকার। এ কারণে ছবিটির শেষভাগের কাজ ব্যাহত হয়েছিল। প্রস্তুতিমূলক নোট দেখে সেন্ট পিটারসবার্গে তার টিম বাকি শুটিং সম্পন্ন করেন। এরপর বাড়িতে বসে নিজেই ছবিটি সম্পাদনা করেন।
‘লেটো’তে কিরিল সেরেব্রেনিকভ তুলে ধরেছেন সোভিয়েত আন্ডারগ্রাউন্ড রক চর্চার উত্থানকে। সাংস্কৃতিক ও মতাদর্শিক বাধা পেরিয়ে যেতে সোভিয়েত আন্ডারগ্রাউন্ড রক ঘরানা তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। আশির দশক থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের বামপন্থী দলের রাজনৈতিক আন্দোলন ‘পেরেসত্রয়িকা’র শুরুতে দিনবদলের খোঁজে থাকা একটি প্রজন্মের আশাও উঠে এসেছে এতে। গান, ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের সম্মিলনে সাজানো গল্প নিয়ে ছবিটি তৈরি হয়েছে সাদাকালো রঙে।
ইওমেদিন-এর একটি দৃশ্যকানের ৭১তম আসরের দ্বিতীয় দিনে প্রতিযোগিতা বিভাগে স্থান পাওয়া মিসরের তরুণ আবু বকর শওকি পরিচালিত ‘ইওমেদিন’ ছবিরও উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়েছে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরে দেখা গেছে এটি। আবু বকর স্বর্ণ পামের পাশাপাশি ক্যামেরা দ’র পুরস্কারের দৌড়েও আছেন। কারণ এটাই তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি। মিসরীয় সমাজের উদাসীনতায় কুষ্ঠরোগীদের সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এতে।
নিজের ছবির মাধ্যমে কুষ্ঠব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষকে অন্যায়ভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাতারে ফেলে দেওয়ার মানসিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন আবু বকর। কারও মুখ আর শরীরে ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়লে মিসরের সমাজ থেকে তাকে বিচ্যুত করা হয়। কায়রো ও সুদানের সীমান্তে এর শুটিং হয়েছে। সাল দুবুসিতে সন্ধ্যা ৭টা, সাল বাজিনে রাত সোয়া ৭টা আর রাত ১০টায়ও ছিল ‘ইওমেদিন’।
প্রতিযোগিতা বিভাগে বুধবার (৯ মে) সকাল সাড়ে ৮টা ও দুপুর ১টায় গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়ের, সকাল সাড়ে ৮টায় সাল দুবুসি ও রাত ৮টায় সাল দ্যু সোসানতিয়েমে আবারও দেখানো হয়েছে উৎসবের উদ্বোধনী ছবি ‘এভরিবডি নৌস’।
আঁ সার্তেন রিগার্দ বিভাগের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘ডনবাস’-এর কলাকুশলী ও কান উৎসবের পরিচালক থিয়েরি ফ্রেমোআঁ সার্তেন রিগার্দ
সাল দুবুসি থিয়েটারে এ বিভাগের উদ্বোধন হয়েছে সকাল সোয়া ১১টায়। এ বিভাগের উদ্বোধনী ছবি ইউক্রেনে জন্ম নেওয়া সের্গেই লজনিৎসার ‘ডনবাস’। একই ভেন্যুতে বিকাল ৪টায়ও ছিল এর প্রদর্শনী। পূর্ব ইউক্রেনের অঞ্চল ডনবাসে যুদ্ধকে বলা হয় শান্তি, প্রপাগান্ডাকে সবাই ধরে নেয় সত্যি ও ঘৃণাকে ঘোষণা করা হয়েছে ভালোবাসা। পরিচালকের চোখে এই আখ্যান শুধু একটি অঞ্চল, দেশ কিংবা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয়। সারাবিশ্বেই এমন চিত্র বিদ্যমান। এটা সবার গল্প।
প্রামাণ্যচিত্র ঘরানায় কাজ করতে ভালো লাগে সের্গেই লজনিৎসার। নিজের ষষ্ঠ ছবি ‘ডনবাস’-এ সেই ধারা অব্যাহত রেখেছেন তিনি। এতে ব্যবহৃত হয়েছে যুদ্ধে ধারণকৃত অপেশাদার কিছু ভিডিও। ২০১৭ সালে কান উৎসবের মূল প্রতিযোগিতায় ছিল তার ‘অ্যা জেন্টেল ক্রিয়েচার’।
৯ মে দুপুর পৌনে ২টা ও রাত সোয়া ১০টায় আঁ সার্তেন রিগার্দ বিভাগে ছিল কেনিয়ার ওয়ানুরি কাহিয়ু পরিচালিত ‘রাফিকি’। এবারই প্রথম কানে অফিসিয়াল সিলেকশনে স্থান পেলো কেনিয়ার কোনও ছবি। যদিও সমকামিতাকে তুলে ধরায় কেনিয়ায় নিষিদ্ধ হয়েছে এটি। তবে এই ছবিকে বলা হচ্ছে সাহসী পদক্ষেপ। এর গল্প নাইরোবিতে হাইস্কুল পড়ুয়া দুই ছাত্রী কেনা ও জিকিকে ঘিরে। নির্বাচনি প্রচারণা চলাকালীন তারা একে অপরের প্রেমে পড়ে। অথচ তাদের বাবা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী।
ডেড সোলস-এর একটি দৃশ্যস্পেশাল স্ক্রিনিং
সাল দ্যু সোসানতিয়েমে সকাল ১০টায় ছিল চীনের ওয়াং বিং পরিচালিত ‘ডেড সোলস’। এর দৈর্ঘ্য ৮ ঘণ্টা ১৬ মিনিট! ১৯৫৭ সালে চীনে ডানপন্থী বিরোধী প্রচারণার সময় অসংখ্য মানুষকে অতি-ডানপন্থী তকমা দিয়ে বন্দিশিবিরে রেখেছিল  বামপন্থীরা। তাদের নিজ বয়ানে সেইসব দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা রয়েছে এ প্রামাণ্যচিত্রে। তাই ‘ডেড সোলস’কে উৎসব আয়োজকরা বলছেন, অতীতে আহত হয়ে থাকা একটি জাতির গল্প।
ধ্রুপদী ছবি
কান ক্ল্যাসিকসে আমেরিকার কিংবদন্তি নির্মাতা ওরসন ওয়েলেসের ওপর নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্রের প্রিমিয়ার হয়েছে সন্ধ্যা পৌনে ৭টায়। ‘দ্য আইস অব ওরসন ওয়েলেস’ নামের ১ ঘণ্টা ৫৫ মিনিট ব্যাপ্তির ছবিটিতে উঠে এসেছে তার চলচ্চিত্র, ড্রইং, চিত্রকর্মসহ শতাধিক কাজ। এটি নির্মাণ করেছেন ব্রিটিশ পরিচালক মার্ক কুজিন্স।
দ্য আইস অব ওরসন ওয়েলেস- এর একটি দৃশ্যসোভিয়েত সিনেমার মাস্টারপিস সের্গেই বন্দারচুকের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস. ফিল্ম ওয়ান. আন্দ্রেই বোলকনস্কি’ (১৯৬৬) দেখানো হয় রাত সোয়া ৯টায়। ১৯৬৯ সালে অস্কারে সেরা বিদেশি ভাষার ছবি বিভাগে পুরস্কার জেতে এটি। ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত লিও তলস্তয়ের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি হয়েছে পাঁচ পর্বের ছবিটি। ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ই এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ছবি। মুদ্রাস্ফীতির পর এর বাজেট গিয়ে দাঁড়ায় ৭০ কোটি ডলারে। সাত ঘণ্টার ছবিটির শুটিংয়ে এর চেয়ে কম টাকায় হতোও না।  এর এমন কয়েকটি দৃশ্য আছে যেগুলোর ব্যাপ্তি প্রায় ১ ঘণ্টা করে।
সকাল ১১টায় পাওলো হসা পরিচালিত ‘দ্য আইল্যান্ড অব লাভ’ (১৯৮২) ও বিকাল ৩টায় ছিল মেক্সিকোর এমিলিও ফার্নান্দেজের ‘এনামোরাদা’ (১৯৪৬)। কানে পাওলো হসার ছবিটির উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়েছিল ৩৬ বছর আগে। জাপানকে নিয়ে বিমুগ্ধ পর্তুগিজ লেখক ওয়েনচেজলাউ ডি মোরাসের জীবনের শেষ ৪০ বছর উঠে এসেছে এতে। ২০১৩ সালে জাপানের এক দ্বীপপুঞ্জে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। তার স্মৃতিকথা অবলম্বনে এই ছবি বানাতে লেগেছিল ১৪ বছর। বুধবার কানে ধ্রুপদী বিভাগের সব ছবির প্রদর্শনী হয়েছে সাল বুনুয়েল থিয়েটারে।
ওয়ার অ্যান্ড পিস, ফিল্ম ওয়ান, আন্দ্রেই বোলকনস্কি- এর একটি দৃশ্যসাগরপাড়ের আয়োজন
কান সৈকতে খোলা আকাশের নিচে ‘সিনেমা ডি লা প্লাজ’ বিভাগে রাত সাড়ে ৯টায় দেখানো হয় মার্ভেল কমিকস অবলম্বনে নির্মিত সাম্প্রতিক ব্লকবাস্টার ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’। এ সময় সেখানে ছিলেন ছবিটির পরিচালক রায়ান কুগলার।
ডিরেক্টরস ফোর্টনাইটের সুবর্ণজয়ন্তী
কান উৎসবে ফ্রেঞ্চ ডিরেক্টরস গিল্ডের আয়োজন ডিরেক্টরস ফোর্টনাইটের ৫০ বছর পূর্তি হলো এবার। এ উপলক্ষে বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় মার্কিন চলচ্চিত্রকার মার্টিন স্করসেসিকে গোল্ডেন কোচ সম্মাননা দেওয়া হয়।
ডিরেক্টরস ফোর্টনাইটে দুপুর আড়াইটায় দেখানো হয় মার্টিন স্করসেসির ১৯৭৩ সালের ছবি ‘মিন স্ট্রিটস’ (রবার্ট ডি নিরো, হার্ভি কিটেল)। এরপর বিকাল সাড়ে ৪টায় স্করসেসিকে দান করে ফ্রেঞ্চ ডিরেক্টরস গিল্ড। তখন তার সঙ্গে আলোচনা করেন ফরাসি পরিচালক জ্যাক অদিয়ার, রেবেকা জোলোতস্কি, সিড্রিক ক্ল্যাপিশ, এবারের আসরের স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি ও সিনেফঁদাসিউ বিভাগের বিচারকদের প্রধান বার্ট্রান্ড বোনেলো।
একই বিভাগে সকাল পৌনে ৯টা ও সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় কলম্বিয়ার সিরো গুয়েরা ও ক্রিস্তিনা গাইয়েগো পরিচালিত ‘বার্ডস অব প্যারাডাইস’। সত্তরের দশকের প্রেক্ষাপটে কলম্বিয়ার মাদক বাণিজ্যকে ঘিরে সাজানো হয়েছে এর গল্প। আদিবাসী একটি পরিবার আমেরিকার যুবসমাজের কাছে গাজা বিক্রি করে চলে।
আঁ সার্তেন রিগার্দ বিভাগের বিচারকরাক্রিটিকস উইক
ডিরেক্টরস ফোর্টনাইটের মতো কানের আরেকটি প্যারালাল সেকশন হলো ক্রিটিকস উইক। এর স্পেশাল স্ক্রিনিং বিভাগে সকাল সাড়ে ৮টা ও সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ছিল পল ড্যানোর ‘ওয়াইল্ড লাইফ’। ষাটের দশকের প্রেক্ষাপটে ছবিটি বানিয়েছেন এই অভিনেতা। এর গল্প ১৪ বছরের কিশোরি জো’কে ঘিরে। মা-বাবার সম্পর্ক ধীরে ধীরে বিয়েবিচ্ছেদের দিকে যেতে দেখলেও সে অসহায়।
সকাল সাড়ে ১১টা, বিকাল সাড়ে ৪টায় ও রাত সাড়ে ১০টায় ছিল হাঙ্গেরির সোফিয়া সিলাগির ‘ওয়ান ডে’। এর গল্প ৪০ বছর বয়সী আনাকে ঘিরে। স্বামী, তিন সন্তান, চাকরি, অর্থনৈতিক চাপ— এ নিয়ে দিন কাটে তার। সে অফিস ও ঘরের সবকিছুই মনে রাখে, যত্ন নেয়। কিন্তু কখনও স্বামীর সান্নিধ্য পায় না বলার মতো। তার মনে হতে থাকে স্বামীকে হারাচ্ছে!
পল ড্যানো ও সোফিয়া সিলাগি উভয়ে আছেন ক্যামেরা দ’র পুরস্কারের দৌড়ে। উভয়েই প্রথমবার পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি পরিচালনা করেছেন।