শেষ বাঁশি বাজার আগে শুরুতে ফিরে যাওয়া যাক। গত ৮ মে কান চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শুরুতে দেখানো হয় জ্যঁ-লুক গদারের ‘পিয়েরো দ্য ম্যাডম্যান’ ছবির একটি দৃশ্য। এতে ফরাসি অভিনেতা জ্যঁ-পল বেলমন্দো ও ডেনিশ অভিনেত্রী আনা কারিনার মধ্যে সংলাপ চলছে, ‘আমি কী করতে পারি? আমি জানি না কী করতে হবে...।’
এ যেন আয়োজকদের মনের কথা। অনুষ্ঠানে মাস্টার অব সিরিমনিস জানিয়ে দিয়েছিলেন, এবারের আয়োজনে উড়বে নতুনের কেতন, থাকবে চমকের মেলা। কারণ কান চলচ্চিত্র উৎসবে নতুন দশক শুরু হয়েছে ৭১তম আসরের মাধ্যমে। সেজন্যই সিনেমার কয়েকজন মাস্টারের পাশাপাশি মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে রয়েছে নবীন পরিচালকদের কাজ।
১৪ দেশের ২১টি ছবি স্বর্ণ পামের লড়াইয়ে এসে দাঁড়িয়েছে শেষ মঞ্চে। তাই দক্ষিণ ফ্রান্সের শহর কানে এখন কান পাতলে একটাই প্রশ্ন শোনা যাচ্ছে, কার ভাগ্যে আছে স্বর্ণপাম? চলচ্চিত্রের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার কার ঘরে যায় সেদিকে তাকিয়ে আছে তামাম দুনিয়া।
তবে স্বর্ণপামের বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা বরাবরই প্রমাণিত হয় বোকামি! যতই পূর্বাভাস করা হোক, শেষ পর্যন্ত সব ভেসে হয়ে যায় চমকের জোয়ারে। তবুও চলছে কানাকানি। সবার মধ্যে এ নিয়ে তুমুল কৌতূহল।
মূল প্রতিযোগিতা বিভাগের বিচারকদের প্রধান কেট ব্ল্যানচেটের মনের ভেতর একবার ঘুরে আসতে পারলে সেই উত্তর মিলে যেতো! কিন্তু অস্কারজয়ী এই অস্ট্রেলিয়ান অভিনেত্রী কী চমক জমা রেখেছেন কে জানে! প্রতি বছরের মতো এবারও হয়তো মানুষ যা ভাবছে, তিনি হয়তো রায় দেবেন উল্টোটা!
কেট ব্ল্যানচেট নারী বলে সমাপনী মঞ্চে কোনও নারীর হাতে পাম দ’র উঠবে বলে ধারণা করছেন বিভিন্ন দেশের সাংবাদিক ও বোদ্ধারা। প্রতিযোগিতা বিভাগের অন্য বিচারকরা হলেন ‘টোয়াইলাইট’ তারকা ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট, ফরাসি অভিনেত্রী লেয়া সেদু, পরিচালক আভা ডুভারনে, বুরুন্ডির গায়িকা খাজা নিন, ‘ক্রাউচিং টাইগার হিডেন ড্রাগন’ তারকা চ্যাং চেন, পরিচালক ডেনিস ভিলেন্যুভ, রুশ পরিচালক আন্দ্রে জিভিয়াজিন্তসেভ ও ফরাসি পরিচালক রবার্ট গেদিজিয়ন।
বিচারকদের তালিকায় দেখা যাচ্ছে পাঁচজনই নারী। তার ওপর হলিউডের নিন্দিত প্রযোজক হার্ভি ওয়াইনস্টিন কাণ্ডে মিটু হ্যাশট্যাগ ও টাইমস আপ আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে এবারের আসরে।
তাই তিন নারী নির্মাতা নাদিন লাবাকি (কেপারনম), অ্যালিস রোরওয়াচার (হ্যাপি অ্যাজ লাজ্জারো) ও ইভা হুসো (গার্লস অব দ্য সান) স্বাভাবিকভাবেই আছেন স্বর্ণ পামের দৌড়ে সামনের সারিতে। এ তিনটিকেই ধরা হচ্ছে ডার্কহর্স। তাদের মধ্যে ১৫ মিনিটের অভিবাদন পেয়ে সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করেছেন লেবাননের নাদিন। তিনি জিতলে ঘটে যাবে নতুন ইতিহাস। কানের ৭১ বছরের ইতিহাসে একমাত্র নারী নির্মাতা হিসেবে নিউজিল্যান্ডের জেন ক্যাম্পিয়ন ‘দ্য পিয়ানো’ ছবির জন্য পাম দ’র জয়ের গৌরব ধরে রেখেছেন।
অভিবাদন পাওয়ার হিসাব করলে স্পাইক লি’র ‘ব্ল্যাকক্ল্যান্সম্যান’ও হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করছে। প্রদর্শনী শেষে গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরে এটি পেয়েছে ৬ মিনিটের করতালি। তার স্বদেশি ডেভিড রবার্ট মিচেলের ‘আন্ডার দ্য সিলভার লেক’ নিয়ে অবশ্য তেমন উচ্চবাচ্য নেই।
একইভাবে সোরগোল নেই উৎসবের উদ্বোধনী ছবি ‘এভরিবডি নৌজ’ নিয়ে। যদিও পাম দ’রের টেরাম টেরাম যুদ্ধে অন্যতম প্রতিযোগী এই ছবির পরিচালক ইরানের আসগর ফারহাদি। তার স্বদেশি জাফর পানাহির ‘থ্রি ফেসেস’কে বাদ দেওয়া যাবে না। ইরানি এই নির্মাতার মতো গৃহবন্দি কিরিল সেরেব্রেনিকভের ‘লেতো’ কান সৈকতে ওড়াতে পারে রাশিয়ার পতাকা। কিরিলের মতো সাদাকালো ছবি বানিয়েছেন পোল্যান্ডের পাওয়েল পাউলোকস্কি। তার ‘কোল্ড ওয়ার’কে ফেভারিট মনে করছেন অনেক বোদ্ধা।
নবীনদের মধ্যে আবু বকর শওকি (ইওমেদিন) ও সিনেমার মাস্টারদের মধ্যে ইতালির মাত্তিও গারোনের ‘ডগম্যান’ নিয়েও অনেকে আশাবাদী।
উৎসবের একেবারে শেষের দিকে প্রদর্শিত ‘ওয়াইল্ড পিয়ার ট্রি’ও আছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে। এর পরিচালক তুরস্কের নুরি বিলগে সেলান ২০১৪ সালে স্বর্ণ পাম জিতেছিলেন।
ফ্রেঞ্চ নিউওয়েভের রূপকার জ্যঁ-লুক গদার বরাবরই ফেভারিট থাকেন। এবারও ব্যতিক্রম নয়। তার ‘দ্য ইমেজ বুক’ সবারই ফেভারিট। বাঘা নির্মাতাদের মধ্যে পাম দ’র জয়ের লড়াইয়ে এবার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ৮৭ বছর বয়সী প্রখ্যাত এই ফরাসি চলচ্চিত্রকার।
প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত ছবিগুলোর মধ্যে ফ্রান্সের ইয়ান গঞ্জালেজ (নাইফ প্লাস হার্ট), ক্রিস্তফ নুহে (সরি অ্যাঞ্জেল) ও স্টেফানি ব্রিজে (অ্যাট ওয়ার) স্বাগতিক দেশে পাম দ’র রেখে দেওয়ার সম্ভাবনা জিইয়ে রেখেছেন প্রশংসা কুড়িয়ে। তবে কান মানেই চমকের পসরা! সুতরাং অপেক্ষা করাই ভালো।
আর কয়েক ঘণ্টা পর শুরু হয়ে যাবে ১২ দিনের বার্ষিক উৎসবটির সমাপনী। সেখানেই ফয়সালা হয়ে যাবে পাম দ’র যাচ্ছে কার ভাগ্যে। শনিবার (১৯ মে) কানের স্থানীয় সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় (বাংলাদেশ সময় রাত সোয়া ১১টা) জমকালো অনুষ্ঠানটি শুরু হবে।