কপিক্যাট মানসিক রোগ: কলকাতায় একের পর এক মডেলের আত্মহত্যা

গত কয়েক দিন ধরে একের পর এক নারী মডেলের আত্মহত্যা কলকাতার নাগরিক জীবনে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। দুই সপ্তাহে আত্মহনন করেছেন চার মডেল-অভিনেত্রী। 

এদের মধ্যে আছেন টেলি পর্দার অভিনেত্রী-মডেল পল্লবী দে, মডেল বিদিশা দে মজুমদার, অভিনেত্রী মঞ্জুষা নিয়োগী ও উঠতি মডেল সরস্বতী দাস।

আত্মহত্যা শুধু একই ধরনের নয়, বয়সের দিক থেকেই তারা প্রায় সমবয়সী এবং একই পেশার। কেন এই আত্মহত্যা? মনোবিদদের মতে, এটা এক ধরনের সংক্রামক মানসিক রোগ, যা চিকিৎসায় সারা সম্ভব। প্রয়োজন এ প্রসঙ্গে সামাজিক সচেতনতা।

কলকাতার ইনস্টিটিউট অব সাইক্রিয়াস্টির সহকারী অধ্যাপক তথা ভারতীয় সাইক্রিয়াটিক সোসাইটির সুইসাইড প্রিভেনশনের দায়িত্ব থাকা ডা. সুজিত সরখেলের মতে, ‘এটা এক ধরনের মানসিক রোগ। যার নাম কপিক্যাট সুইসাইড। একটি আত্মহত্যার ঘটনা শুনে তার মতো অবিকল আত্মঘাতী হওয়া।’

তিনি বলেন, ‘‘যাদের আত্মহত্যা প্রবণতা রয়েছে কিন্তু তারা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিলেন, তাদের এ ধরনের ঘটনায় আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। এটা বড় সমস্যা। বিশ্বজুড়েই এখন এটা আলোচনার বিষয়। একই স্টাইলে, একই পেশা ও প্রায় সমবয়সীদের আত্মহত্যা। কারণ, এরা অন্যের সঙ্গে সহজেই নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারেন এভাবে, ‘আমিও মডেল, ও মডেল। আমার মতো লড়াই করে পারছিল না। ও যে পথটা বেছে নিয়েছে ওই পথটাই মুক্তির উপায়।’ এক্ষেত্রে পেশাগত চাপ, অর্থের চাপ কাজ করে। তারপরে বয়স। যে বয়সে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে, এই বয়সটা ঝুঁকির মাথায় কিছু করার বয়স। ভারতে সারা বছরেই এই বয়সের মানুষের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। শুধু তাই নয়, ১৮ থেকে ২৮ বয়স পর্যন্ত আত্মঘাতী ঘটনা সবচেয়ে বেশি আমাদের দেশে।’’

ডা. সুজিত সরখেল বলেন, ‘এর থেকে বাঁচতে হলে বাড়ির লোক, বন্ধুবান্ধব সবাইকে সবসময় নজর রাখতে হবে। যাকে সন্দেহ করা হচ্ছে তার সোশাল মিডিয়ায় চোখ রাখতে হবে। সে এসব ঘটনা নিয়ে কী বেশি প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে? সংবাদমাধ্যমে এ ধরনের ঘটনা বারবার দেখলে এ ধরনের রোগীদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব পড়ে। সেদিকটাও খেয়াল রাখা দরকার। বাড়ির লোকদের দেখতে হবে আপনার সন্তান হঠাৎ করেই নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে কিনা। বাবা-মাকে সতর্ক হতে হবে। এ ধরনের চিন্তা মনে হঠাৎ করেই হয়। কিছুটা ঝড়ের মতো। ওই সময়টা আটকে দিলে এ ধরনের মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব। মনোবিদের সাহায্য নিতে হবে।’

মোটিভেশনাল স্পিকার সুমন ঘোষের মতে, ‘বয়সের সঙ্গে বুদ্ধি একটু বাড়ে বটে তবে আসলে যেটা বেশি বাড়ার কথা সেটি অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতাটি শুধু বাড়লেই হবে না, তার সঠিক প্রয়োগ আসলে আমাদের ম্যাচিওরড করে তোলে। বাচ্চা ধূপকাঠির আগুনেও হাত দিয়ে দিলে, চিনে যায় আগুন কত ভয়ানক, আর আগুনে হাত দেয় না। বাচ্চাটির ওটাই ম্যাচিওরিটি। এই ম্যাচিওরিটিটি না এলেই মুশকিল। ওই যে না ফেরার দেশে চলে গেলো, কয়েকজন অল্প বয়সী মডেল বা অভিনেত্রী, তারা মনের যত্ন সেভাবে নেননি বলেই আমার ধারণা। তারা তাদের পোশাক-আশাক, প্রসাধন, ক্যাটওয়াক, জিম, লাইট, সাউন্ড, ক্যামেরা, লুক ইত্যাদির প্রতি যতটা যত্নবান ছিলেন কিন্তু ততটা তাদের মনের প্রতি যত্নবান ছিলেন না। মনটা ছুটতো পিচ্ছিল পথে, ওই পিচ্ছিল পথটাই হয়ে গিয়েছিল ওদের মোটিভেশন। ওই খানেই তারা শেষবারের মতো স্লিপ করে গেলো। জীবনে চলার পথ সহজ নয়, পিচ্ছিলতা তো আছেই। সেই পিচ্ছিল পথে হোঁচট হলে একটা আশ্রয় লাগে। একজন জীবনমুখী মোটিভেটর তখন তাকে সঠিক পথে ফেরায়। সঠিক ও বেঠিক পথের তফাতটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, সফল মানুষের উদাহরণ সামনে রেখে। তাদের জীবনের ওঠাপড়ার কাহিনি বলে। ক্রমাগত ইন্সপিরেশন দিয়ে। আজই চাই, এক্ষুনি চাই, যেভাবে হোক চাই এবং যাকে চাই তাকেই যেনতেন প্রকারে চাই, এটি একটি মারাত্মক চাহিদার প্রকাশ। ওরা নিজের জন্য সেই সময়টুকুই দিলো না। রাতারাতি আকাশ ছোঁয়ার চিন্তাটাই হয়তো ওদের পাতালে নিয়ে চলে গেলো।’

উল্লেখ্য, গত কয়েক দিনের ব্যবধানে কলকাতায় চার জন মডেল তথা অভিনেত্রীর অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। কিছু দিন আগে গরফায় বাড়ি থেকেই মেলে টেলিপর্দার অভিনেত্রী পল্লবী দে-র ঝুলন্ত দেহ। তারপরে গত বুধবার (২৫ মে) নাগেরবাজারের বাড়িতে একই অবস্থায় পাওয়া যায় উঠতি মডেল বিদিশা দে মজুমদারকে। শুক্রবার (২৭ মে) সকালে পাটুলির বাড়িতে ঝুলন্ত দেহ মেলে অভিনেত্রী মঞ্জুষা নিয়োগীর। রবিবার (২৯ মে) রাতেই ফের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করা হয় রূপটান শিল্পী তথা উঠতি মডেল সরস্বতী দাসেরও।